আরজি করের নির্যাতিতার শোকসভায় কেঁদে ফেললেন শুভেন্দু “বারুইপুরে পুলিশ যা করার করেছে। যত কঠোর হওয়ার দরকার, সরকার হবে”
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘আমি যা করার করছি, করব, এর শেষ দেখে ছাড়ব।’ অভয়ার মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এভাবেই হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার বোনের মায়ের মাথায় লাঠি পড়েছিল। অভয়ার মাকে হাসপাতালেও ভর্তি নিতে চায়নি। ভয়ঙ্কর অত্যাচারী শাসকের হাতে ছিল বাংলা। আমি যা করার করছি, করব, এর শেষ দেখে ছাড়ব। আজ সব হাসপাতালে মাথানত করে অভয়া-স্মরণ হয়েছে। অভয়াকাণ্ডের ভয়ঙ্কর স্মৃতি চিরকাল থাকবে। অভিযুক্ত বা সম্ভাব্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে আইনি পথে পদক্ষেপ করব। এমন ঘটনা আর যেন না ঘটে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মতো প্রেমের ঘটনা বলব না। বারুইপুরে পুলিশ যা করার করেছে। যত কঠোর হওয়ার দরকার, সরকার হবে। পুলিশকে বলেছি, নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে অপেক্ষা করবেন না। কারও ফোনের অপেক্ষা করতে হবে না। এর শেষ আমাদের দেখতেই হবে।’
আজ সেই অভিশপ্ত ৯ অগাস্ট। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তরুণীকে ধর্ষণ করে হত্যার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ধর্ষণ-খুনের শিকার চিকিৎসকের স্মরণে রবিবার রাজ্যের সমস্ত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করা হল। নির্যাতিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নীরবতা পালনের আগে প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হয়। নির্ধারিত সময় সকাল ১১টায় চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। সরকারের আহ্বানে এই প্রথম আরজি করের নির্যাতিতার স্মরণে রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শনিবার রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পরই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, নির্যাতিতার স্মরণে রবিবার সকাল ১১টায় রাজ্যের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে নীরবতা পালন করা হয়। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালেও এই কর্মসূচি পালন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল রাজ্যসভার সাংসদ শান্তনু সেন। আরজি কর-কাণ্ডের পর থেকেই আন্দোলনে সরব ছিলেন তিনি। নির্যাতিতার স্মরণে নীরবতা পালনের পর শান্তনু সেন তদন্ত নিয়ে মুখ খোলেন। সত্য উদঘাটনে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি, ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় যারা তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করেছে বলে অভিযোগ, তাদেরও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বিকেলে পানিহাটিতে অভয়া স্মরণ মঞ্চে বক্তব্য রাখেন অভয়ার মা, বিজেপির বিধায়ক রত্না দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘লড়াইটা আমি ছাড়িনি। ও হয়তো হসপিটালের কিছু জেনে ফেলেছিল…।’ আরও বলেন, ‘কারও জন্য আর রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। ওকে স্কুলে একবার মাথা শব্দটি দিয়ে বাক্যরচনা করতে দিয়েছিলেন শিক্ষক। ও লিখেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাথা আছে। সেটা পরে শিক্ষক আমাকে ডেকে দেখান। নির্যাতিতা হিসেবে নয়, আমি চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে যাব। রোগীদের খুব যত্ন করত আমার মেয়ে। ওর বাবা বলত, আমার মেয়ে ভীষণ দামি। সত্যি রত্ন পেয়েছিলাম, যেটা হারিয়ে ফেলেছি। লড়াই ছাড়িনি.. কত রাত মেয়ের সঙ্গে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। আর কোনও মেয়েকে এরকম নির্যাতিতা হতে না হয়।’ রত্না দেবনাথ যখন কথাগুলো বলছেন, শুনে কেঁদে ফেলেন মঞ্চে বসে থাকা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছতেও দেখা যায়।
নির্যাতিতার শবদাহ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম ও আইনি গাফিলতির অভিযোগে রাজ্য পুলিশের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকায় পৃথক মামলা রুজু করে জড়িতদের অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
নবান্নে প্রশাসনিক সলাপরামর্শের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয়া রত্না দেবী নতুন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুনর্তদন্তের আর্জি জানিয়ে আমাকে চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যসচিব ও বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৫২ সালের বিশেষ কমিশন আইনের আওতায় পুনর্তদন্তের ঘোষণা করছি।’ আদালতের নির্দেশে সিবিআই মূলত তিনটি দিক—নৃশংস ধর্ষণ ও খুন, ২০২৪ সালের ১৪ অগস্ট রাতে আরজি করে পরিকল্পিত ভাঙচুর এবং হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। সেই তিন ক্ষেত্রে রাজ্য পুলিশের হস্তক্ষেপর সুযোগ না থাকলেও, রাজ্য প্রশাসনের এক্তিয়ারভুক্ত একটি বড় ফাঁক বের করা হয়েছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর অভিযোগ, ঘোলা থানার অন্তর্গত নাটাগড় কদমতলা শ্মশানে নির্যাতিতার দাহকার্য প্রক্রিয়ায় বেআইনি কাজ করা হয়েছিল। তিনি জানান, দাহকার্যের সিরিয়াল ৩ নম্বরে থাকলেও রাতারাতি তা বদলে ১ নম্বর করে তড়িঘড়ি সৎকার করা হয়। শ্মশানের নির্ধারিত খরচ পরিবারের লোক দেয়নি, এমনকি মৃতার পরিবারের কোনও ক্লোজ রিলেটিভ বা নিকটাত্মীয়ের বাধ্যতামূলক স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি। এই গুরুতর বেআইনি কর্মকাণ্ডের পেছনে সরাসরি প্রভাবশালী যোগের দাবি তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখার্জি মিলে এই পুরো কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন।’

স্মরণসভায় উপস্থিত ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারকে মঞ্চ থেকেই অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন শুভেন্দু। তিনি স্পষ্ট জানান, শ্মশানের এই অনিয়মের অংশে যেহেতু সিবিআই তদন্তের সুযোগ নেই, তাই রাজ্য পুলিশ স্বাধীন ভাবে কাজ করে আইনি পদক্ষেপ করবে।
বক্তব্যে আবেগপ্রবণ হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অভয়া বোনকে ভুলিনি! রাজ্যবাসী আমাদের জয়ীই করেছেন তাঁর ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার জন্য। প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়েও আমি আবার বলছি—আমি কমিটেড, আমি কমিটেড, আমি কমিটেড। বোনের বিচারের জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।’