শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
“রাজ্যের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে শেষ করে দিয়েছে তৃণমূল।” বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দুর্নীতির জেরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রায় ২৬০০০ চাকরি ছাঁটাইয়ের আবহে এভাবেই তৃনমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের নয়া সুর বেঁধে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার আলিপুরদুয়ারের প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভার মঞ্চ থেকে তৃণমূল বিরোধিতার সুর তুঙ্গে তুলে মোদী অভিযোগ করেন, এখন যা পরিস্থিতি হয়েছে, তাতে আদালত ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে আর কোনও গতি নেই। প্রতিটি বিষয়ে আদালতকে হস্তক্ষেপকে করতে হচ্ছে। এভাবে কোনও সরকার চলতে পারে না।
দুর্নীতির জেরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের এসএসসি-র গোটা প্যানেল বাতিল হয়ে গিয়েছে। শিক্ষক সহ ২০১৬-র এসএসসি-র গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মীদের চাকরি চলে গিয়েছে। প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলাও বিচারাধীন। আর এবার শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলা নিয়ে তৃণমূল সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন। এদিন নরেন্দ্র মোদি বলেন, “ভ্রষ্টাচারের সবথেকে খারাপ প্রভাব পড়ে যুব সম্প্রদায়ের উপর। গরিব এবং মধ্যবিত্তরা এর ফল ভোগ করে। কীভাবে চারদিক থেকে বরবাদ করে দেওয়া যায়, সেটা আমরা শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতিতে দেখেছি। তৃণমূল সরকার শাসনকালে হাজার হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যত নষ্ট করে দিয়েছে। ওঁদের পরিবার, সন্তানদের শেষ করে দিয়েছে। তৃণমূল বাংলার ছেলেমেয়েদের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। এটা শুধু কয়েক হাজার শিক্ষকের জীবন নিয়ে খেলার বিষয় নয়, রাজ্যের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে শেষ করে দিচ্ছে। শিক্ষকদের উপর লক্ষ লক্ষ শিশু নির্ভরশীল। তৃণমূলের নেতারা এত বড় পাপ করেছে। এখনও নিজেদের অন্যান্য স্বীকার করছে না। উল্টে আদালতকে দোষী বলছে।” প্রধানমন্ত্রী এদিন বলেন, “তৃণমূলের নেতারা এত বড় পাপ করেও নিজেদের ভুল মানতে নারাজ। হাজার-হাজার পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলা হয়েছে। গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা বরবাদ। শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেও তৃণমূলের নেতারা মানতে নারাজ। বাংলায় হাজার-হাজার শিক্ষকের কেরিয়ার বরবাদ। এখানকার যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘোরতর নিরাশা তৈরি হয়েছে। কর্মহীনতার যন্ত্রণায় ভুগছে যুবরা। বেপরোয়া দুর্নীতি নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে লাগাতার মানুষের বিশ্বাস কমছে।”
এই পরিস্থিতিতে আগামী বছর তৃণমূলকে উৎখাত করার ডাক দিয়ে মোদী স্লোগান বেঁধে দেন, “পুরো বাংলা বলছে, বাংলায় হচ্ছে চিৎকার, আর চাই না নির্মম সরকার।” তৃণমূল সরকার কতটা ‘নির্মম’, সেটা বোঝাতে একাধিক উদাহরণও দেন মোদী। কোন পাঁচটি সংকটের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ আছে, তাও জানান। মোদী বলেন, “প্রথম সংকট হল, সমাজে ছড়ানো হিংসা এবং অরাজকতা। দ্বিতীয় সংকট হল, মা ও বোনেদের সুরক্ষাহীনতা এবং তাঁদের উপরে ঘটে যাওয়া জঘন্য অপরাধ। তৃতীয় সংকট হল, যুবক-যুবতীদের মধ্যে চেপে বসা হতাশা এবং বেকারত্ব। চতুর্থ সংকট হল, দুর্নীতির দাপট এবং সরকারের উপর থেকে উঠে যাওয়া বিশ্বাস। পঞ্চম সংকট হল, গরিবের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া শাসক দলের স্বার্থান্বেষী রাজনীতি।”
ভারতীয় সেনার ‘অপারেশন সিঁদুরে’র পরে রাজ্যে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার আলিপুরদুয়ারে জনসভা থেকে মোদির ভাষণে উঠে এল বাংলার উন্নয়নের কথা। আলিপুরদুয়ারে দুপুর ২টো নাগাদ পৌঁছোনোর কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দু’ঘণ্টা আগেই তিনি সেখানে পৌঁছে যান তিনি। মোদি বলেন, “বিকশিত ভারত গড়ে তুলতে হলে, বাংলারও উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলাকেও নতুন উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাকে ফের অতীত ভূমিকায় ফির আসতে হবে। বাংলা মেক ইন ইন্ডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলা নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখে দ্রুত এগিয়ে যাক। বাংলার উন্নয়নের জন্য হাজার কোটি বিনিয়োগ করেছে কেন্দ্র। কেন্দ্রের উদ্যোগেই কল্যাণী এইমস তৈরি হয়েছে। নিউ আলিপুরদুয়ার, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পুনর্গঠন করা হয়েছে। ফ্রেট করিডর তৈরি করা হচ্ছে, কলকাতা মেট্রোর উন্নতি করা হয়েছে। বাংলার উন্নয়নেই বিকশিত ভারতের জয়। বাংলার ভবিষ্যত ঠিক করবে যুবরাই।”
বাংলার উন্নয়নে তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপিকে বাংলার মসনদে বসানোর আহ্বান জানান মোদী। একেবারে কোমর বেঁধে বিজেপি নেতাদের ভোটের ময়দানে নেমে লড়াই করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “সততার সঙ্গে সবকা সাথ, সবকা বিকাশ মন্ত্র মেনে বাংলার উন্নয়নের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিজেপি সরকার। এটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। যুব প্রজন্ম এবং আপনাদের সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। আপনাদের সবাইকে একত্রিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।”
মোদী বলেন,”চা বাগানের শ্রমিকদেরও ছাড়েনি এরা। এই সরকারের দুর্নীতির জন্য চা বাগান বন্ধ হচ্ছে। শ্রমিকদের হাতে কাজ নেই। পিএফ নিয়ে যা হয়েছে সেটা ঠিক নয়। গরিব মানুষকে টাকা দেওয়া হচ্ছে না। আর তৃণমূল সরকার এই দোষীদের বাঁচাচ্ছে। কিন্তু বিজেপি এটা হতে দেবে না। রাজনীতি নিজের জায়গায়, কিন্তু গরিব-দলিত- পিছিয়ে পড়া শ্রেণি-মহিলাদের সঙ্গে কেন রাজনীতি করছে তৃণমূল? ওবিসি নিয়ে যে যে সুবিধা আছে তা বাংলায় লাঘুই হতে দেয় না। একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্য সরকার এখানে চালু করে না।”
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নিয়ে মোদী বলেন, “গোটা দেশে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প মিলছে। কিন্তু এখানকার মানুষদের মিলছে না এই সেবা। দেশের সত্তরোর্ধ্ব ৫ লাখের উপরে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা মিলছে। চাই এখানেও সেই সুবিধা মানুষ পাক। কিন্তু তৃণমূল সরকার তা করতে দিচ্ছে না।”
আবাস যোজনা প্রকল্পে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মোদী বলেন, “বাংলায় একলাখের বেশি ঘর তৈরি হচ্ছে না। কারণ, তৃণমূল এখানে সেই গরীব লোকদের কাছ থেকে কাটমানি নিচ্ছে।”
বিশ্বকর্মা প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পশ্চিবঙ্গের কারিগরী কাজ করা মানুষদের জন্য বিশ্বকর্মা প্রকল্প করেছে বিজেপি সরকার। কিন্তু এখনও ৮ লক্ষ মানুষের সেই পরিষেবা ঝুলে রয়েছে। কারণ, তৃণমূল সরকার তা লাগু করতে দেয়নি।”
পিএম জনমান যোজনা প্রসঙ্গে মোদী বলেন, “আদিবাসীদের জন্যও কম শত্রুতা করেনি। পিএম জনমান যোজনাকে এখানে কার্যকর করতে দেয়নি এখানকার সরকার। আদিবাসীর সম্মান নিয়ে পরোয়া নিয়ে তৃণমূলের। বিজেপি দ্রৌপদী মূর্মুকে রাষ্ট্রপতি বানানোর সময় বিরোধিতা করেছিল তৃণমূলই।”
নীতি আয়োগের বৈঠকে মমতার অনুপস্থিতি নিয়ে নরেন্দ্র মোদীর অভিযোগ, “নীতি আয়োগ বৈঠক খুব গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সেখানে বিকাশ নিয়ে চর্চা হয়। কিন্তু বাংলার সরকার সেই বৈঠকে যোগই দেয়নি। তৃণমূলের তো শুধু ২৪ ঘন্টা রাজনীতি ছাড়া কিছুই আসে না। রাজ্যের প্রগতি, তাঁদের ইচ্ছাতেই নেই।”
একই সঙ্গে মোদীর সংযোজন, “পশ্চিমবঙ্গে ১৬টি পরিকাঠামো উন্নয়্ন প্রকল্প বন্ধ করে রেখেছে এখানকার সরকার।”
বৃহস্পতিবার বঙ্গসফরে এসে মোদি বলেন, “আজ সিঁদুর খেলার বাংলার ভূমিতে এসেছি। তাই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভারতের নতুন সংকল্প নিয়ে চর্চা হওয়া খুব স্বাভাবিক। ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওতে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল তারপর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যেও অনেক ক্ষোভ জন্মেছিল। সন্ত্রাসবাদীরা আমাদের বোনেদের সিঁদুর মুছে দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিল। আমাদের সেনারা সিঁদুরের শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা ওই আতঙ্কবাদীদের মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে যেটা পাকিস্তান কল্পনাও করতে পারেনি। পাকিস্তানের কাছে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো ছাড়া আর কিছু নেই। ওদের কোনও ভালো দিক নেই। দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই ওরা শুধু আতঙ্কবাদীদের পুষেছে। দেশভাগের পর থেকে ওরা শুধু ভারতের উপর হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশে যেভাবে খুন, ধর্ষণ চালিয়েছিল পাকিস্তানের সেনা সেটা কেউ ভুলবে না। এটাই ওদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যখন সম্মুখ সমর হয় তখন পাকিস্তান নিজের অবস্থান বুঝে যায়। এজন্যই ওরা সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য নেয়। কিন্তু পহেলগাঁও হামলার পর ভারত বিশ্বকে বলে দিয়েছে ভারতে সন্ত্রাসী হামলা হলে শত্রুকে তার বড় দাম দিতে হবে। পাকিস্তান মনে রাখুক আমরা তিনবার ওদের ঘরে ঢুকিয়ে মেরেছি। আমরা শক্তির পূজা করি। আমরা মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো করি। এটা ১৪০ কোটির ভারতবাসীর বার্তা – অপারেশন সিঁদুর এখনও শেষ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গকে এখন হিংসা, তুষ্টিকরণ, দাঙ্গা, মহিলা অত্যাচার, দুর্নীতির রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে।”