কলকাতা সারাদিন বিনোদন ডেস্ক।
পূর্ব ভারতে আত্মপ্রতিকৃতি বা ‘সেলফ পোর্ট্রেট’-কেন্দ্রিক শিল্পচর্চা আজও তুলনামূলকভাবে বিরল। বিশেষত আত্মপ্রতিকৃতিকে কেবল নিজের মুখচ্ছবির উপস্থাপনা হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত ভাবনা, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও আত্মঅন্বেষণের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন এমন ভারতীয় শিল্পীর সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত। বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে এই ধারার অন্যতম উজ্জ্বল নাম ছিলেন মেক্সিকান শিল্পী ফ্রিদা কাহলো। পরবর্তীকালে ইন্দো-হাঙ্গেরীয় শিল্পী অমৃতা শেরগিল তাঁর শিল্পভাষায় সেই আত্মপ্রকাশের ধারা নতুনভাবে রূপায়িত করেছিলেন বলেই তাঁকে অনেকেই ‘ভারতের ফ্রিদা কাহলো’ নামে অভিহিত করতেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আত্মপ্রতিকৃতির ক্যানভাসে জীবন, অনুভব, স্মৃতি ও আত্মসংগ্রামের বহুমাত্রিক আখ্যান রচনা করে নজর কেড়েছেন বাংলার বহুমুখী প্রতিভাধর শিল্পী সৌমিতা সাহা। তাঁর শিল্পকর্মে আত্মপ্রতিকৃতি কেবল একটি মুখ নয়, বরং এক অন্তর্জাগতিক যাত্রার দলিল। সামাজিক মাধ্যমে শিল্পমনস্ক নেটাগরিকদের একাংশ তাই স্নেহ ও প্রশংসার সঙ্গে তাঁকে কখনও ‘একুশ শতকের ফ্রিদা কাহলো’, আবার কখনও ‘বাংলার ফ্রিদা কাহলো’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো বেঙ্গল আর্ট ফ্যাক্টরি আয়োজিত বহুল প্রতীক্ষিত শিল্পপ্রদর্শনী ‘সামার কালার কার্নিভাল’। বেঙ্গল আর্ট ফ্যাক্টরির কর্ণধার ও কিউরেটর কিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই মনোরম প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল নানান শৈলী, ভাবনা ও অভিব্যক্তির অসংখ্য শিল্পকর্ম। এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে সৌমিতা সাহার দুটি অনন্য আত্মপ্রতিকৃতি।
অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে নির্মিত দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী আত্মপ্রতিকৃতি উপস্থাপন করেন শিল্পী সৌমিতা সাহা। শিল্পীর এক চিত্রকর্ম ‘ছায়ানট’— যার নামকরণ করা হয়েছে বর্ষার রাগ ‘ছায়ানট’-এর অনুপ্রেরণায়। এই আত্মপ্রতিকৃতিতে শিল্পী নিজেকে সবুজ শাড়িতে বর্ষাস্নাত এক স্বপ্নময় সত্তা হিসেবে কল্পনা করে ক্যানভাসে রূপায়িত করেছেন। দাবদাহের ক্লান্ত আবহে ‘ছায়ানট’ যেন শীতল বৃষ্টিধারার পরশ, প্রশান্তি ও পুনর্জাগরণের এক কাব্যিক রূপক।
অপরদিকে ‘এলিসিয়াম ডিসোন্যান্স’ একটি জ্যামিতিক বিমূর্তধর্মী আত্মপ্রতিকৃতি, যেখানে অসংখ্য নকশা, বিন্যাস ও পুনরাবৃত্ত প্যাটার্নের অন্তরালে শিল্পী নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কার করেছেন। চিত্রকর্মটি সম্পর্কে সৌমিতা সাহা বলেন, “আসলে ‘এলিসিয়াম ডিসোন্যান্স’ আমার জীবনেরই গল্প। চলার পথে বহু ঘটনা এবং তাদের পুনরাবৃত্তির চক্রে আমি নিজেকে বারবার আবদ্ধ অবস্থায় খুঁজে পেয়েছি। সেই অদৃশ্য লুপ ভেঙে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতাই এই ছবির মূল প্রেরণা।”

প্রদর্শনীতে যেমন উপস্থিত স্থান পেয়েছে বহু বর্ষীয়ান স্বনামধন্য শিল্পী এক ঝাঁক তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের অনবদ্য শিল্পকর্ম। জুন মাসের ২ থেকে ৭ তারিক ব্যাপী এই চলবে বিড়লা অ্যাকাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচারের দোতলার গ্যালারিতে।

অনুষ্ঠানে ‘শিল্পী গৌরব সম্মান’-এ সম্মানিত হন শিল্পী সৌমিতা সাহা সহ আরও দুজন শিল্পী। এই সম্মাননা তাঁদের শিল্পসাধনা ও সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রদর্শনীর উদ্বোধন ও ‘শিল্পী গৌরব সম্মান’ প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অন্যতম আর্ট কিউরেটর তথা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের প্রাক্তন ডিরেক্টর ড. জয়ন্ত সেনগুপ্ত, পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য সরকারের মাননীয় বিধায়ক শ্রী অমিত সামন্ত, হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অধ্যাপিকা প্রফেসর নন্দিনী সাহু , স্কটিশ চার্চ কলেজে principal ড. সুপ্রতিম দাসএবং বিড়লা অ্যাকাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচারের কিউরেটর উমা রায়। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির মর্যাদা ও গুরুত্বকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।