সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
শুক্রবার সকালে মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল মুর্শিদাবাদের বহরমপুর। রেলগেট পেরিয়ে লাইনে উঠে পড়া একটি স্কুলভ্যানে ট্রেনের সরাসরি ধাক্কায় মৃত্যু হল ৫ জনের। নিহতদের মধ্যে চারজন স্কুল পড়ুয়া এবং একজন স্থানীয় বাসিন্দা। এই ঘটনায় আরও ৪ জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এদিন সকালে ছোট ছোট পড়ুয়াদের নিয়ে একটি স্কুলভ্যান স্কুলের দিকে যাচ্ছিল। ঘটনার সময় ওই রেলগেটটি বন্ধ ছিল। একটি ট্রেন চলে যাওয়ার পর গেটম্যান রেলগেটটি তুলে দিলে লাইনে ঢোকে ভ্যানটি। কিন্তু অভিযোগ, ঠিক সেই মুহূর্তেই অপর লাইনে চলে আসে আর একটি ট্রেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রেনটি সরাসরি স্কুলভ্যানটিতে ধাক্কা মারে। ছিটকে পড়ে পড়ুয়ারা।
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে হাত লাগান। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ুয়াদের উদ্ধার করে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ৩ জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। হাসপাতালে ২জনের মৃত্যু হয়। বাকি ৪ জনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। গেটম্যানকে ঘিরে ধরে চলে বিক্ষোভ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘটনার সময় কর্তব্যরত গেটম্যান মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বহরমপুর থানার পুলিশ। অভিযুক্ত গেটম্যানকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শিবরাম মাঝি জানান, কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে গেটম্যান ও সুপারভাইজারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বহরমপুর থানার পুলিশ অভিযুক্ত গেটম্যানকে গ্রেফতার করে। তবে সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত সাসপেনশন ছাড়া অন্য কোনও কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হয়নি।

দুর্ঘটনার তীব্রতা বিবেচনায় রেলমন্ত্রকের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারপিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও মৃতদের পরিবারপিছু ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল আগের সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আগের সরকার উন্নয়নের কোনো কাজ করতে দেয়নি। বহু জায়গায় ওভারব্রিজের পরিকল্পনা থাকলেও বাধা দেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট প্রাণ চলে গেল, এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। যে দায়িত্বে ছিল, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দুর্ঘটনার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই ঘটনায় কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তায় জানান, ঘটনার পরই রাজ্য পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ করে দায়িত্বে থাকা রেল গেটম্যানকে গ্রেফতার করেছে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যাঁদের গাফিলতি বা দায় প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী লিখেছেন, রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছে। দুর্ঘটনায় মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্বও নিয়েছে সরকার।