কলেজের ভেতরে টাকা ভর্তি ব্যাগ! তালা ভাঙতেই চাঞ্চল্য, বিজেপি-সিপিএমের তীব্র আক্রমণের মুখে তৃণমূল
বিতস্তা সেন। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে এমন দৃশ্য কেউ কল্পনাও করেননি। কলেজের ইউনিয়ন রুমের তালা ভাঙতেই সামনে এল এমন এক ছবি, যা ঘিরে এখন তোলপাড় গোটা রাজ্য।
দুই ব্যাগ ভর্তি নগদ টাকা। আর সেই টাকার বড় অংশই নষ্ট করে দিয়েছে উইপোকা!
ঘটনাস্থল কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। মঙ্গলবার কলেজ চত্বরে যা ঘটেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইউনিয়ন রুমে এত বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা এল কোথা থেকে, কেনই বা এতদিন তা পড়ে ছিল—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে সর্বত্র।
সূত্রের খবর, কলকাতা পুরনিগমের কর্মীরা নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত কাজ করতে কলেজে পৌঁছেছিলেন। মশার লার্ভা ও নোংরা জমার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে গিয়ে নজরে আসে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা একটি ইউনিয়ন রুম।
অধ্যাপকদের অনুমতি নিয়ে সেই ঘরের তালা খোলা হলে প্রথমে চোখে পড়ে কয়েকটি আলমারি। এরপর আলমারি খুলতেই সামনে আসে দুই ব্যাগ ভর্তি নগদ টাকা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, টাকার একাংশে ইতিমধ্যেই উইপোকার আক্রমণের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়।
খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই কলেজ চত্বরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশও। প্রাথমিকভাবে টাকা উদ্ধার করে তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
যদিও টাকার সঠিক পরিমাণ নিয়ে এখনও সরকারি কোনও ঘোষণা হয়নি, তবে স্থানীয় মহলে আলোচনা, উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক দশ লক্ষ টাকার মধ্যেও হতে পারে। সেই জল্পনাই রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছেন বরাহনগরের বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ। তিনি দাবি করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল। তাঁর অভিযোগ, ছাত্রদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে সংগৃহীত অর্থের হিসাব নিয়ে স্বচ্ছতা ছিল না।
সজল ঘোষ বলেন, “একের পর এক জায়গা থেকে নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। এবার কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকে টাকা পাওয়া গেল। কতদিন ধরে এই টাকা সেখানে ছিল, কারা এর দায়িত্বে ছিল, সবকিছুর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।”
তিনি আরও দাবি করেন, কলেজের বিভিন্ন তহবিল নিয়েও আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানান।
রাজনৈতিক বিতর্কে যোগ দিয়েছে বাম শিবিরও। সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ কটাক্ষ করে বলেন, “যে টাকা বছরের পর বছর ব্যবহারই করা হয়নি, তা উইপোকার খাদ্য হয়ে গেছে। এর পেছনে কী কারণ রয়েছে, মানুষ তার উত্তর জানতে চায়।”
এদিকে কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান পড়ুয়াদের একাংশের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নগদ টাকা কেন সংরক্ষিত ছিল? যদি কোনও তহবিলের অর্থ হয়, তবে তা ব্যাংকে জমা না রেখে এভাবে রাখা হয়েছিল কেন?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ইউনিয়ন রুমের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। স্থানীয় সূত্রে দাবি, অতীতে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির প্রভাব ছিল ওই ঘরে। তবে সেই দাবির সত্যতা এখনও সরকারি তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তদন্ত যত এগোবে, ততই হয়তো সামনে আসবে আরও তথ্য। কলেজ প্রশাসন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রিপোর্টের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সবাই।
কলেজের আলমারিতে লুকিয়ে থাকা উইয়ে খাওয়া টাকার এই রহস্য কি শুধুই অব্যবস্থাপনার ফল, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কোনও গল্প? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে গোটা বাংলা।