বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় প্রথম বড় কর্মসূচি, সংবিধান হাতে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: ক্ষমতা হারানোর পর এই প্রথম বড় রাস্তায় নামা। আর সেই মঞ্চ থেকেই সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিলেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দাঁড়িয়ে তৃণমূল সুপ্রিমোর কণ্ঠে শোনা গেল তীব্র রাজনৈতিক হুঙ্কার— “জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হটাকে যায়েঙ্গে।” মুহূর্তের মধ্যে সেই স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে সমর্থকদের মধ্যে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে এই বার্তা আগামী দিনের বিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা স্পষ্ট করে দিল।
ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উপর নির্যাতন চলছে বলে অভিযোগ তুলে আগেই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন মমতা। প্রথমে রানী রাসমণি রোডে কর্মসূচির পরিকল্পনা থাকলেও পুলিশের অনুমতি না মেলায় শেষ পর্যন্ত ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলেই ধর্নামঞ্চ গড়ে ওঠে।
দুপুরে প্রথমে সংবিধান প্রণেতা ডঃ বি.আর. আম্বেদকর এবং পরে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মমতা। তারপর দলীয় সাংসদ, বিধায়ক ও শীর্ষ নেতাদের নিয়ে পৌঁছে যান ধর্নাস্থলে। তাঁর হাতে ছিল ভারতের সংবিধানের একটি কপি, যা নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিতেও ভোলেননি তিনি।
মঞ্চে উঠে মমতা অভিযোগ করেন, বাংলার বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দলবদলের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং প্রশাসনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানো হচ্ছে।
“আমাদের বিধায়ক, সাংসদ, কাউন্সিলরদের ভয় দেখানো হচ্ছে। কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। মানুষের জন্য লড়াই করতে হবে,”— কর্মীদের উদ্দেশে বলেন তিনি।
এদিন আরও এক ধাপ এগিয়ে মমতা দাবি করেন, বহু আসনে ভোটে অনিয়ম হয়েছে। যদিও সেই অভিযোগের কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি মঞ্চে তুলে ধরেননি, তবুও সংবিধান রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন।
“সংবিধানের প্রতিটা শব্দ রক্ষা করব। যতদিন কণ্ঠ আছে, ততদিন মাথা নত করব না,”— তাঁর এই মন্তব্যে সমর্থকদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
ধর্নামঞ্চ থেকেই পুলিশের অনুমতি প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, কর্মসূচির জন্য একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে। যদিও তিনি স্পষ্ট করেন, পুলিশের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত কোনও অভিযোগ নেই।
“পুলিশকে আমি দোষ দিচ্ছি না। প্রশাসনে ছিলাম, জানি ওরা নির্দেশ মেনে কাজ করে,”— বলেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে একদিকে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে অন্যদিকে সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের ধার বজায় রাখার কৌশল নিয়েছেন মমতা।
ধর্নাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ-সহ তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা। কলকাতা পুরসভার বহু কাউন্সিলর এবং বিপুল সংখ্যক দলীয় কর্মী-সমর্থকও সেখানে ভিড় করেন।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় মমতার এই প্রথম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হওয়ায় তা ঘিরে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

ধর্নামঞ্চ থেকে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তৃণমূল কর্মীদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হলে রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে পারে দল। এমনকি লালবাজার, নবান্ন এবং থানাগুলি ঘেরাওয়ের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
দিনের শেষে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসে তাঁর শেষ বার্তা— “মারলে মারো, কিন্তু মাথা নত করাতে পারবে না।”
রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন অধ্যায় কি তবে শুরু হয়ে গেল? ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে ছোড়া এই বার্তা এখন বাংলার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।