সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যেই মোহভঙ্গ। বুধবার বিকেলে তৃণমূলের যে ৫৮ বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে অনাস্থা প্রকাশ করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কে নিজেদের নেতা বলে মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন চিঠিতে। তাদের মধ্যেই একটা বড় অংশ এবার ঋতব্রত নেতৃত্ব মানতে অস্বীকার করছেন।
বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভায় ঋতব্রত নিজের অনুগামী ৫৮ বিধায়ককে ডেকেছিলেন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য। কিন্তু ঋতব্রত যেভাবে বুধবার সাংবাদিক বৈঠক করার সময় মমতাকে নেত্রী না বলে প্রধান পরামর্শদাতা হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে অপমান করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়করা।
‘আমাদের বলা হয়েছিল, মমতার নেতৃত্বেই দল চলবে। মমতা শুধু পরামর্শদাতা নয়, আমরা চাই, ওনার নেতৃত্বেই দল চলুক। মমতাকে সর্বোচ্চ নেত্রী মানা না হলে, বিদ্রোহী ব্লকে থাকব কি না, ভাবতে হবে’, বিদ্রোহী ব্লকের বৈঠকের পর মন্তব্য পাঁচলার তৃণমূল বিধায়ক গুলশন মল্লিকের।
বুধবার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, ‘আমি একটা কথা স্পষ্ট ভাবে বলে দিতে চাই, আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। আমরা চাই, উনিই আমাদের পরামর্শদাতা হোন। আমাদের পরিষদীয় দলকে পরামর্শ দিন। উনি থাকলে আমরা ভাল কাজ করতে পারব। অষ্টাদশ বিধানসভার সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরদূরান্তে কোনও সম্পর্ক নেই।’ গতকাল, ঋতব্রতের এই বক্তব্যকে বিদ্রোহী বিধায়করা সমর্থন করলেও আজ, বৃহস্পতিবার উলটপুরাণ। ‘পরামর্শদাতা নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই আমাদের নেত্রী। ওনাকে নেত্রী হিসেবেই দেখতে চাই।’ এদিন এমনটাই জানিয়েছেন পাঁচলার তৃণমূল বিধায়ক গুলশন মল্লিক। তাঁর দাবি, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে না মানা হলে আমাদের অন্য চিন্তাভাবনা করতে হবে।’
গুলশনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট, তাঁরা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ। বিদ্রোহ দেখিয়ে, তৃণমূল সুুপ্রিমোর নির্দেশ না মেনে নিজেদের মতো করে পরিষদীয় দল গঠন করেছেন ৫৮ জন বিধায়ক। কিন্তু তাঁদের নেত্রী মমতাই। তাঁর বাইরে কাউকে নেতা মানতে নারাজ। এদিন সেই বিষয়েও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন গুলশন মল্লিক। সূত্রের খবর, এদিন এমএলএ হস্টেলে হাওড়ার বেশ কয়েকজন বিধায়ক বৈঠকে বসেছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন পাঁচলার গুলশন মল্লিক, মধ্য হাওড়ার অরূপ রায়, বাগনানের অরুণাভ সেন, উদয়নারায়ণপুরের সমীর পাঁজা। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরামর্শদাতা নয়, নেত্রী হিসেবে মমতাকেই চাই। তার অন্যথা হলে আলাদা চিন্তাভাবনা করবেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশ। এই একই বক্তব্য রেখেছেন সিতাইয়ের তৃণমূল বিধায়ক সঙ্গীতা রায় বসুনিয়াও।
তৃণমূল বিধায়ক গুলশন মল্লিক বলছেন, ‘আজকের বৈঠকে এলাকার সমস্যা, কেস-কাছারি, পুলিশের অত্যাচার এইসব নিয়ে কথা হয়েছে। এইসব ব্যাপারে ডিজি এবং মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হবে। সেই বিষয়ে একটি টিম তৈরি হয়েছে। তারা কথা বলবে।’ পাঁচলার বিধায়ক আরও বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে চাই। সেদিন সই করার আগেও আমার বক্তব্য যা ছিল, আজও তাই আছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে এই কথাটা হয়েছে ঠিকই যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বোচ্চ নেত্রী না মানা হয়, তাহলে আমাদের ভাবতে হবে।’
পাঁচলার দীর্ঘদিনের তৃণমূল বিধায়ক গুলশন মল্লিক। গতকাল সই করেছিলেন। আজ বৈঠকেও ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন তাঁরা, হাওড়ার বিধায়করা চান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নেত্রী হিসেবে মান্যতা দিতে হবে এই ব্লকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি রাখতে হবে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে তাঁদের এরকম কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। ৫৮ জন তৃণমূল বিধায়কের সই নিয়ে যে ব্লক তৈরি হয়েছে, সেখানকার মিটিং-মিছিলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি রাখা যাবে না, এটা তাঁরা মানছেন বলে জানিয়েছেন গুলশন মল্লিক। তবে মমতাবন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি রাখতে হবে। সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে ব্লকে তাঁকেই মান্যতা দিতে হবে। অন্যথায় তাঁদের অন্য কিছু ভাবতে হবে।

তাঁর দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে ‘আসল তৃণমূলে’র সর্বোচ্চ নেত্রী চান। পরামর্শদাতা নন। সেরকমই নাকি কথা হয়েছিল। তাঁর কথায়, “মমতাদিকে বাদ দিয়ে কিছু করব, এমন ইচ্ছা নেই।” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে অবশ্য ‘আসল তৃণমূলে’র অবস্থানের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন তিনি। যদি ‘আসল তৃণমূল’ মমতাকে সর্বোচ্চ নেত্রী না করে, সেক্ষেত্রে সরে আসার মতো বড়সড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও মত গুলশন মল্লিকের। এবার দেখার আগামিদিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়। আর তার উপরেই যে ‘আসল তৃণমূলে’র ভবিষ্যতের নির্ভর করছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।