শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
“এনআইএ তদন্ত হলেই আসল রহস্য সামনে চলে আসবে” দাবি তুলে মুর্শিদাবাদের ওয়াকফ সংক্রান্ত অশান্তির ঘটনায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করানোর দাবি তুললেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এই পরিস্থিতিতে ধুলিয়ানে যেতে চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্যর বক্তব্য, এই সময়ের মধ্যে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা সেখানে গিয়েছেন।
শুভেন্দু অধিকারীও যাওয়ার জন্য পুলিশের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন গত 13 এপ্রিল। কিন্তু পুলিশ অনুমতি দেয়নি। জানা গিয়েছে, বুধবার দ্বিতীয়ার্ধ্বে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ বিরোধী দলনেতার আবেদন শুনবেন বলে জানিয়েছেন। তবে কলকাতা হাইকোর্টের শুভেন্দুর এই মামলার পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের ঘটনায় এনআইএ তদন্তের আর্জি জানিয়ে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আইনজীবী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল এবং আইনজীবী সংযুক্তা সামন্ত৷ তাঁরা এদিন জানিয়েছেন, মুর্শিদাবাদের ঘটনায় 300 পরিবার ঘরছাড়া তাদের অবিলম্বে ঘরে ফেরাতে হবে। পাশাপাশি ঘটনার এনআইএ তদন্ত করতে হবে। আলাদা আলাদা দু’টি আবেদন ও মামলা দায়ের করার অনুমতি চেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। মামলা দায়ের করার অনুমতি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি টিএস শিবাজ্ঞানম ও বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় দাসের ডিভিশন বেঞ্চ। এই মামলার শুনানি হতে পারে বৃহস্পতিবার।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে মুর্শিদাবাদের ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার প্রেক্ষিতেও প্রকৃত সত্য সামনে আনার জন্য এনআইএ তদন্তের প্রয়োজন বলে আজ দাবি করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
ওয়াকফ হিংসায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বুধবার নেতাজি ইন্ডোরে ইমাম-মোয়াজ্জেনদের সঙ্গে বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফায় দফায় সুর চড়ান বিএসএফের বিরুদ্ধে। সাফ বলেন, “বিএসএফও গুলি চালিয়েছে, তার বিরুদ্ধেও অ্যাকশন হবে। চিক সেক্রেটারিকে বলছে এর তদন্ত রিপোর্ট হওয়া উচিত। শীতলকুচিতেও গুলি চালিয়ে এরা চারজনকে মেরেছিল।” গোটা ঘটনার নেপথ্যে সুর থেকেই চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছে তৃণমূল। এদিন মমতার মুখেও শোনা গেল সেই কথা। প্রয়োজনে তদন্তও হবে, স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন মমতা। নেতাজি ইন্ডোর থেকে মমতা বলেন, “আমি অনেক ভিডিয়ো দেখেছি। লোকাল লোকেরা আমাকে পাঠিয়েছে। বলছে, আমরা হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে থাকি বাইরে থেকে বিএসএফের মতো ড্রেস পরে চলে এসেছে পায়ে জুতো নান পরে নন্দীগ্রাম কায়দায়। আসল ঘটনা কী তদন্ত করে দেখব।” পাল্টা এনআইএ তদন্তের দাবি তুলে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সাফ কথা, এনআইএ তদন্ত হলেই আসল রহস্য সামনে চলে আসবে। পাল্টা এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দু বলেন, “এই জন্যই তো এনআইএ চাই। প্রমাণ হয়ে যাবে কে করেছে। ধুলিয়ানের চেয়ারম্যান, সামশেরগঞ্জের বিধায়ক, ফারাক্কার বিধায়কের দাদা, এরা কী করেছে আমরা ভিডিয়ো দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছি।”
প্রসঙ্গত, কয়েকদিন আগে ‘চক্রান্তের’ কথা শোন গিয়েছিল কুণাল ঘোষের মুখেও। ক্ষোভ উগরে দেন বিএসএফের ভূমিকা নিয়েও। সাফ বলেছিলেন ‘বিএসএফের একাংশের মদতেই হামলাকারীদের ঢুকিয়ে বাংলায় অশান্তি পাকানো হচ্ছে’। নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, “গায়ে সেনার পোশাক পায়ে হাওয়াই চপ্পল কী করে হতে পারে? এগুলো আমরা নন্দীগ্রামে দেখেছি। পুলিশ পায়ে চটি পরে গুলি চালাচ্ছে। কারা ছিল? হার্মাদ বাহিনী ছিল। সিপিএম ক্যাডাররা ছিল। ওখানে চটি পরা পুলিশ, এখানে চটি পরা বিএসএফ! সত্যিই বিএসএফ তো? আমরা তদন্ত চাইতে পারি না?” এবার মমতার মনেও বিএসএফ নিয়ে সন্দেহ দানা বাধায় তা নিয়ে জোর চর্চা রাজনৈতিক মহলে। এখন দেখার শেষ পর্যন্ত টানাপোড়েনের জল কোনদিকে গড়ায়।
আক্রান্ত ও নিহত দুই হিন্দুর মৃত্যুর প্রতিবাদে আজ অর্থাৎ বুধবার যে ‘হিন্দু শহিদ দিবস’ পালন করা হবে, সেকথা আগেই ঘোষণা করেছিল রাজ্য বিজেপি। নিজেদের এক্স হ্যান্ডেলে তার ভার্চুয়াল প্রচারও করেছিল তারা। সেই মতো এদিন সেই কর্মসূচি পালন করার সময়েই ফের একবার মুর্শিদাবাদ ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের নেতাদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
এদিন শুভেন্দু অধিকারী-সহ অন্য বিজেপি বিধায়করা সাদা-কালো পোশাক পরে এবং হাতে কালো পতাকা ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিধানসভার বাইরে জমায়েত করেন। সেই জমায়েত থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন ও তৃণমূল নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় তুলে একের পর এক তোপ দাগেন শুভেন্দু।

এদিন প্রথমে বিধানসভার বাইরে একটি অস্থায়ী শহিদ বেদী নির্মাণ করা হয়। সেখানে শুভেন্দু-সহ অন্যরা মুর্শিদাবাদে নিহত দুই হিন্দু বাসিন্দার স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তারপরই শুভেন্দু বলেন, গত লোকসভা নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সংখ্যালঘুরা মূলত কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন। সেই ভোট তৃণমূলে টানতেই রাজ্য়ের শাসকদল মুর্শিদাবাদে হিংসার ঘটনা ঘটিয়েছে! এর জন্য সরাসরি মমতাকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “ওঁর ফরাক্কার এমএলএ-র দাদা, ওঁর সামশেরগঞ্জের এমএলএ, ওঁর ধুলিয়ানের চেয়ারম্যান, তাঁরা কী করেছেন, আমরা ভিডিয়ো দিয়ে প্রমাণ করেছি।” এনআইএ তদন্ত হলেই সবটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। অর্থাৎ – সামগ্রিকভাবে মুর্শিদাবাদের হিংসার ঘটনার জন্য তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বকেই দায়ী করেন শুভেন্দু। একইসঙ্গে, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোলেন মিথ্যাচারের অভিযোগ। এদিনের এই কর্মসূচি ঘিরে প্রতিবাদী বিজেপি বিধায়করা ফের একবার প্রকাশ্যেই মেরুকরণের রাজনীতিতে শান দেন। তাঁদের মুখে স্লোগান শোনা যায় – ‘দুনিয়ার হিন্দু এক হও’, ‘বাংলার হিন্দু এক হও’, ‘চোর মমতা হায় হায়’, ‘খুনিদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা হায় হায়’, ‘খুনি মমতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে একসাথে’, ‘পুলিশ মন্ত্রী হায় হায়’ ইত্যাদি।
প্রসঙ্গত, মুর্শিদাবাদে বাবা ও ছেলেকে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় ইতিমধ্য়েই আলাদাভাবে তদন্ত করেছে সিট। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে একাধিক দুষ্কৃতীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গতকাল (মঙ্গলবার – ১৫ এপ্রিল, ২০২৫) জানা যায়, সেই ঘটনায় দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সম্পর্কে একে অপরের ভাই। তাদের একজনকে মুর্শিদাবাদের সুতি এবং অন্যজনকে বীরভূমের মুরারই থেকে পাকড়াও করেছে পুলিশ।