মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ: “ভবানীপুরে সেন্ট্রাল ফোর্স দিয়ে ছাপ্পার ছক, ভোট লুটের চেষ্টা হলে রাস্তায় নামব আমি”
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভোটের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন চরমে, তখন উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দলের সভামঞ্চ থেকে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ছাপ্পা ভোট করানোর ছক কষা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ভোট প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগও আনেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রথম দফার ভোটের আগে শেষ মুহূর্তের প্রচারে হলদিয়া থেকে শুরু করে জগদ্দল, ব্যারাকপুর, বড়বাজার এবং ভবানীপুর— একাধিক কেন্দ্রে সভা করেন মমতা। জগদ্দলে তৃণমূল প্রার্থী সোমনাথ শ্যামের সমর্থনে আয়োজিত সভা থেকেই তিনি অভিযোগ করেন, ভবানীপুরের তিনটি ওয়ার্ডে বিশেষভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে ভোট লুটের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মমতার কথায়, তাঁর কেন্দ্রের ৭৭ ও ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড-সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গোলমাল পাকানোর ছক রয়েছে। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোথাও গন্ডগোলের চেষ্টা হলে তিনি নিজে সেখানে পৌঁছে যাবেন। ভোটে কারচুপির যে কোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তোলার বার্তাও দেন তিনি।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই মমতা বোঝাতে চান, ভবানীপুরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করার জন্য বিরোধীরা প্রশাসনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে চাইছে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধীদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
সভামঞ্চ থেকে মমতা আরও অভিযোগ করেন, ভোটের আগেই তৃণমূলের কয়েকজন প্রথম সারির নেতাকে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা চলছে। যদিও তেমনটা হলেও তৃণমূল কর্মীদের ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলেও সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে আটকানো যাবে না। ভোটারদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ভোট দেওয়ার ডাক দেন তিনি এবং বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে বাধা এলে তা রুখে দিতে হবে।
এখানেই থামেননি তৃণমূল নেত্রী। ভোটের দিন থেকে গণনা পর্যন্ত ইভিএমে কারচুপির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পোলিং স্টেশন থেকে কাউন্টিং সেন্টারে যাওয়ার পথে মেশিন বদলের চেষ্টা হতে পারে। তাই কর্মী-সমর্থকদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশলের একটি বড় অংশ স্পষ্ট হয়ে যায়— ভোট প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করা।
হলদিয়ার সভা থেকে মমতার আক্রমণের মূল নিশানা ছিলেন বিজেপিতে যোগ দেওয়া প্রাক্তন তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নাম না করেই তিনি বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় কাকে গ্রেফতার করতে হবে, সেই তালিকা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের একাংশকে ব্যবহার করে বিরোধী শক্তিকে দমন করার চেষ্টা হচ্ছে।
শুভেন্দুকে নিশানা করে মমতা আরও বলেন, হলদিয়ার শিল্পাঞ্চল ও পরিবহণ ব্যবসা থেকে নিয়মিত কাটমানি তোলার অভিযোগ রয়েছে। এই আর্থিক লেনদেনের তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, শুধুমাত্র তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ হিসেবে দেখা হবে।
পূর্ব মেদিনীপুরকে “গদ্দারদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না”— এই বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, জেলার প্রতিটি আসনে তৃণমূলকে জেতাতে হবে, যাতে সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, পূর্ব মেদিনীপুরকে তিনি মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছেন।
নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে মমতা অভিযোগ করেন, অতীতে সেখানে ভোট লুট হয়েছে এবং এখনও সেই মামলার বিচারাধীন। এবারও একই রকম কারচুপির চেষ্টা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমনকি এনআইএ-র নোটিস পাঠানো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনের মুখে এই ধরনের পদক্ষেপের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
মমতা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের বহু অফিসারকে বদলি করে বিজেপি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের আনা হয়েছে। পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, পুলিশ একপক্ষ হয়ে কাজ করছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক।
তিনি আরও বলেন, বাংলাকে টার্গেট করে দিল্লি থেকে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী, সাজোয়া গাড়ি মোতায়েন করে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, নির্বাচন কি যুদ্ধক্ষেত্র যে এত বাহিনী নামাতে হবে? এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।
তবে তাঁর বক্তৃতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল সংগঠনের কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা। মমতা বলেন, “আমরা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করে বেঁচে থাকি, বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব না।” অর্থাৎ, ভোটের ময়দানে লড়াইয়ের মনোভাব বজায় রাখতেই তিনি এই ভাষা ব্যবহার করেছেন।
তিনি ভোটারদের বলেন, “প্রার্থীকে ভুলে যান, সব কেন্দ্রে আমি প্রার্থী।” এই বক্তব্য তৃণমূলের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রীয় বার্তাকে সামনে আনে— ভোটকে মমতা বনাম বিজেপির লড়াই হিসেবে তুলে ধরা। এতে দলীয় প্রার্থীদের চেয়ে নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মমতার অভিযোগ, ভিনরাজ্যে থাকা শ্রমিকদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার শপথ করিয়ে ট্রেনের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগের মাধ্যমে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটার প্রভাবিত করার অভিযোগ তুলেছেন। যদিও এর পক্ষে সরাসরি কোনও প্রমাণ তিনি দেননি, তবুও রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তা তাৎপর্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, রাজ্যের সরকারি কর্মীদের ডিএ আটকে রাখার জন্যও নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বাজেটে ঘোষিত ৪ শতাংশ ডিএ নির্বাচন কমিশনের কারণে আটকে আছে, কিন্তু ভোটের পর তা দেওয়া হবে। এতে সরকারি কর্মীদের উদ্দেশে আশ্বাসের বার্তা পৌঁছে দিতে চান তিনি।
পুরো বক্তৃতা জুড়ে মমতা একদিকে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব থেকেছেন, অন্যদিকে কর্মী-সমর্থকদের রাস্তায় নেমে ভোট রক্ষার বার্তা দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের আগে কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখা এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করাই ছিল এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।
নির্বাচনের ঠিক আগে এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে মমতা বুঝিয়ে দিলেন, এই লড়াই শুধুই আসন জয়ের নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষারও। ভবানীপুর থেকে নন্দীগ্রাম— প্রতিটি কেন্দ্রকে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন। আর সেই কারণেই তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে উঠে আসছে সংঘর্ষ, প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের সুর।

বাংলার ভোট যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে— এই নির্বাচনে প্রচারের ভাষা হবে আরও তীব্র, অভিযোগ হবে আরও ধারালো, আর রাজনৈতিক মেরুকরণ পৌঁছবে নতুন উচ্চতায়। জগদ্দলের সভা থেকে মমতার এই বিস্ফোরক অভিযোগ সেই বাস্তবতাকেই আরও প্রকট করে দিল।