সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘লাভলি টিভিতে কাজ করেন। এলাকাও করে। নতুন যারা হয়, নতুন বাড়িতে ঢুকতে একটু ভুলভ্রান্তি হতেই পারে। আমার কি ভুল হয়নি? পরে সেটা শুধরে নেওয়ার সময় দিন। ও পার্টির খুব অনুগত। আমি দেখেছি, বিধানসভায় লাভলি এবং ফিরদৌসি প্রতিটা অধিবেশনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত থাকে। তখন ও সিরিয়াল বাদ দিয়ে এই কাজটা করে। মানুষের কাজ করা বড় কাজ।’ শনিবার উত্তর এবং দক্ষিণের জনসভা থেকে এভাবেই সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক লাভলি মৈত্রের বিরুদ্ধে ওঠা অসন্তোষের প্রেক্ষিতে তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানালেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সেই সঙ্গে তৃণমূল সরকারের আমলে সোনারপুর এলাকার উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে মমতা বলেন, ‘রাজপুর টাউনের উন্নয়ন, কামালগাজি, নরেন্দ্রপুরে যা পেরেছে করে দিয়েছি। আগে বারুইপুরে যেতে সময় লাগত। এখন গড়িয়া থেকে পরের পর উড়ালপুলে উঠি।
আজ যে অপদার্থ দাঁড়িয়েছে, তাঁর মধ্যে নাম বলতে চাই না, শীতলখুচিতে তিনি থাকার সময়ে ভোটের দিন গুলি চালিয়ে চার জনকে হত্যা করা হয়। লাভলির বিরুদ্ধে কে দাঁড়িয়েছে, জানি না। খোঁজ রাখি না। বাংলায় কথা বললেই অনুপ্রবেশকারীদের কারখানা। সীমান্ত, বাহিনী কার হাতে? শুল্ক বিভাগ কার হাতে? তোমাদের হাতে। আমি রেলমন্ত্রী ছিলাম। সোনারপুরে কত রেল দিয়েছি, জানি। ভোটের সময়ে চার্জশিট দিয়ে বলছো, তৃণমূল চোর। তৃণমূল চোর হলে তুমি সুপার ডাকাত।’
শনিবার সকালে প্রথমে এক উলুবেড়িয়ার জনসভা থেকে ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায় এবং পুলক রায়ের সমর্থনে নির্বাচনী জনসভা করার পর মমতা জনসভা করেন বারুইপুর এবং ভাঙ্গড়ে। জনতার কাছে শওকত মোল্লাকে ভাঙড় থেকে জয়ী করার আবেদন জানিয়ে তিনি বললেন, ‘শওকতকে জেতান, ভাঙড়ে আপনারা যা চাইবেন, তাই করে দেব। কোনও নির্দলকে অথবা বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, এমন কোনও দলকে একদম ভোট নয়।’
এরপর প্রার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘শওকতদের সিকিউরিটি তুলে নিতে চায় বিজেপিকে ওর প্রতি কোনও হামলা হলে ছেড়ে কথা বলব না। হিম্মত নেই! আমার সঙ্গে লড়তে পারে না, শওকত মোল্লাদের সঙ্গে লড়াই করে মরছে। আমি বাঁ হাত হলে শওকত আমার ডান হাত। এদের উপর কোনও অত্যাচার হলে ছেড়ে কথা বলব না। বিজেপির নেতারা ২০টা করে সিকিউরিটি নিয়ে ঘুরে বেরবে, আর শওকতদের সিকিউরিটি তুলে নেবে! আমি বলছি, মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে খেলবেন না। দরকার হলে আমার সিকিউরিটি তুলে নিয়ে দরকার হলে শওকতকে দেব। আমি গুন্ডাদের ভয় পাই না, কিন্তু বিজেপিকে ছাড়ব না।’
অন্যদিকে শুক্রবার রাতে লোকসভায় কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে সংবিধান সংশোধনী বিল এনেও ভোটাভুটিতে হেরে গিয়েছে তার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘বিজেপির ঔদ্ধত্য বেড়েছিল। কাল হেরে আজ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। দূরদর্শন নিজের কব্জায় নিয়েছে। আগে রাজীবজির আমলে বলত রাজীবদর্শন। এখন মোদীদর্শন। বাচ্চাদের স্কুলে ভাষণ শোনায় ওদের মগজধোলাই করে। ইতিহাস, ভূগোল, সংবিধান বদলে দিচ্ছে। গান্ধীজিকে অবমাননা। নেতাজিকে বলছে সন্ত্রাসবাদী। রানি রাসমনিকে বলছে রসমণি। হার্মাদের দল। সিপিএমের হার্মাদ এখন ওদের। বড় জল্লাদ। বিজেপি ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন। অত্যাচার করছে। নাম কাটছে। আপনি বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে বছরে ২ কোটি লোককে চাকরি দেবেন। ১২ বছরে ২৪ কোটি চাকরি দেওয়ার কথায় দিয়েছেন? রেল, সেল, এলআইসি বিক্রি করেছেন। বলেছিলেন কালো টাকা ফেরাবেন। আজ পর্যন্ত পেরেছেন? সকলের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেবেন। দিয়েছেন? উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, ওড়িশায় অত্যাচার হয় কেন? বিজেপি নিজেদের রাজ্যে মাছ-ডিম খাওয়া বন্ধ করো। লিখে এনে বাংলা বলো। ধোঁকাবাজ। সব্জি দামি। তাই মায়েরা মাছের ঝোল করে ছেলেমেয়েকে খাইয়ে স্কুলে পাঠান। নয়তো ঘি, ছানা আনতে হবে। আমি সব খাই— ধোকা, ধোকলা। আমি সব পুজো করি। সব ধর্মস্থানে যাই। তোমরা কেন পারবে না? রাজ্যের দেড় কোটি লোককে বুকে করে রাখি। আইটি অফিসারকে গাজ়িয়াবাদে থাকতে দেওয়া হয়নি। বহিরাগতদের কারখানা বাংলা করতে দেবে না। সারা জীবন যারা এখানে, তাদের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ২০২৫ সালে যারা এসেছে, তাদের দিচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে লড়াই করেছি। ৩২ লক্ষ নাম তুলেছি। তার মধ্যেও ভ্যানিশ কুমার নাম কাটছে বলে শুনেছি। বিছুটি পাতা দিয়ে কিছু বানান। সঙ্গে চুন দিন। ওটা মুখে মাখলে সাদা হবে। বিজেপি-কে সাদা করুন। এ বার হবে দুরন্ত খেলা। আমরা যা বলি, ভোটের আগেই করি। যুবসাথী, ২৫ শতাংশ ডিএ দিয়েছি। বাজেটে যা বলেছি, ৪ শতাংশ দেব। চাকরি করে দেব বলেছি। একটা গ্যাংম্যানও নিয়োগ করোনি তোমরা। কাল হেরে বাবুর খুব দুঃখ হয়েছে। আজ তিনি ভাষণ দেবেন। বলবে মা-বোনদের জন্য পাশ করাল না। সামনে রেখেছে মহিলা। পিছনে কয়লা। মহিলা বিল আলাদা। ওটার মধ্যে ঢুকিয়েছিল ডিলিমিটেশন। তার পরে এনআরসি করে আপনাদের সকলকে ডিটেনশন শিবিরে পাঠানো হত। চক্রান্ত করা হত। ধরতে পেরে আমরা সকলে জোট বেঁধে ধরাশায়ী করেছি। আগামী দিনও বাংলাকে টার্গেট করেছে বলে ধরাশায়ী করব। বিজেপি মানে দেশের সর্বনাশ। আমরা সংরক্ষণ নিয়ে ভাবি না। রাজ্যসভায় ৪৬ শতাংশ মহিলা। দল মনোনয়ন দেয়। আমি না-ও দিতে পারতাম। দিয়েছি। লোকসভায় আমার ৩৭ শতাংশ মহিলা সাংসদ। আপনি কেন মহিলা বিলের সঙ্গে ডিলিমিটেশন ঢুকিয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল, ডিলিমিটেশন করে দেশভাগ, বাংলা ভাগ করা। আমরা দেব না।
সব বদলে প্রশাসনকে ভয় দেখাচ্ছেন। বিজেপির পরিবারের লোকজন অবজার্ভার নয়, কনজার্ভার হয়ে এসেছে। যতই করো হামলা এ বার নেব বদলা। কে প্রার্থী মনে রাখবেন না, আমাকে ভালবাসলে, আস্থা থাকলে জোড়াফুলে ভোট দেবেন। সরকার আমিই গড়ব। দয়া করে জোড়াফুলে ভোট দেবেন। দিল্লি থেকে এসে বলছে তিনি ২৯৪টি আসনের প্রার্থী। তিনি তো বাংলার ভোটারই নন। আগে ইস্তফা দিন, তার পরে আসুন।’