শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘যাঁদের হাতে রক্ত মিশে, তাঁরা বাংলার মানুষকে অনুপ্রবেশকারী বলে অসম্মান করেন। বলেছিল প্রতি বছরে ২ কোটি চাকরি দেবে। দিয়েছে কী? একটা গ্যাংম্যানকেও চাকরি দিয়েছে রেলে? বলেছিল ১৫ লক্ষ টাকা দেবে, এক পয়সাও দিয়েছে? নোটবন্দির সময় মায়েদের জমানো পয়সা কেড়ে নিল। তার পর সবাইকে রাস্তায় ফেলে দিল। সে জন্য আমি লক্ষ্মীর ভান্ডার করেছিলাম।’ বৃহস্পতিবার এভাবেই উত্তরবঙ্গের একের পর এক জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নাম না করে তীব্র আক্রমণ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজেপি এবং সিপিএমকে এক গোত্রে ফেলে আক্রমণ শানিয়ে মমতার অভিযোগ, ‘আমার সঙ্গে পেরে উঠছে না। তাই এ সব করছে। সিপিএম কত খুন করার চেষ্টা করেছে তা-ই পারেনি। এরা কী করবে বড়জোড় প্রাণে মেরে ফেলবে, আইন ডোন্ট কেয়ার। মানুষের সঙ্গে ছিলাম, আছি থাকব। তাই বলি কোনও ভয় পাবেন না। এটা শুধু ইলেকশন পর্যন্ত চমকানো। তার পরে এরা কোথায় হারিয়ে যাবে, আর দেখা পাবেন না। তৃণমূল এ বার আগের থেকে বেশি ভোটে জিতে আসবে। আমাকে সব বিরোধী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ফোন করছেন, জিজ্ঞাসা করছেন আসব? আমি ঠিক টুগেদার করে দেব। তৃণমূল কংগ্রেস সবার সঙ্গে থাকবে। আমরা চেয়ার চাই না। যাঁদের ভোট আছে তাঁরা ভোট দিতে যাবেন। আর যাঁদের নাম ওঠেনি, তাঁরা নৈতিক সমর্থন দেবেন। আমরা চেষ্টা করেছিলাম নাম তোলার। আগামী দিনেও চেষ্টা করে যাব। আমাদের সরকার থাকতে কোনও এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প করতে দেব না। বিজেপিকে এনআরসি করে পাঠিয়ে দেব। বাংলার উপর হিংসা, বাংলাকে দেখলেই মনে জ্বালা!
যে লিস্টে আপনি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন, বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে বাংলা দখল করার চেষ্টা করছেন। কখনও ধর্মের নামে, কখনও ভোটের নাম বিক্রি করছেন, কখনও লুটের নামে বিক্রি করছেন। বাইরে থেকে এনআইএ নিয়ে এসে নিজেরাই বোমা মারবে। তার পর তোমাদের নামে দোষ দেবে। বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে বোমা মারবে, তার পর তোমাদের গ্রেফতার করবে। এই ক’টা দিন ধৈর্য ধরে নামগুলো রেকর্ড করে রাখো। কিন্তু কেউ কোনও গন্ডগোলে যাবে না। ভোট লুট যাতে করে না পারে, সেটা নজর রাখবে। ভোটের সময় মডেল কোড অব কনডাক্ট ভেঙে যা খুশি করছ। এদের মতো মীরজাফর পাবেন না কোথাও। তৃণমূল এ বার আরও অনেক বেশি আসনে জিতে বাংলা দখল করবে। কোচবিহার থেকে হোক শুরু। সারা বাংলায় জয়ের গর্জনে তৃণমূল ডাকবে গুরু গুরু।’
মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে বিজেপি নেতারা অবিচার করছেন বলে অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, ‘জানেন, মতুয়াদের দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছিল, আমি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমি গিয়ে বললাম এই ভুলটা করবেন না। আপনাকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে, আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছে ’২৫ সালে। ভোটে কারও নাম ওঠেনি। হাজার হাজার ভোট বাদ মতুয়াদের। রাজবংশীদের কত ভোট বাদ। এনআরসির নোটিস পাঠিয়েছে। অমিত শাহ কাল বলেছেন, এর পর যাঁর ভোট থাকবে না তাঁকে বাংলা থেকে তাড়িয়ে দেব। যেন জমিদারি, দাঙ্গা করার জমিদারি। কেউ বাংলা থেকে যাবে না। বাংলার যাঁরা নাগরিক সবাই বাংলাতেই থাকবেন। যাঁদের ভোট কেটেছে ট্রাইবুনালে আবেদন করে রেখে দেবেন। যেন রেকর্ড থেকে যায়। আজ না-হয় কাল উঠবেই।’
ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার যে হুঁশিয়ারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছিলেন সেই প্রসঙ্গ টেনে মমতার দাবি, ‘অমিত শাহ কাল বলেছেন, যাঁর নাম থাকবে না, তাঁকে তাড়িয়ে দেব। বর্ডারগুলি লক্ষ রাখবেন। বাইরে থেকে লোক ঢুকবে ভোট দিতে। অসম থেকে লোক আসবে। বাংলায় তো ডানা ওদের ছাঁটবই। জিতবে, ঘেঁচু করবে। বিজেপির রাজ্যে কোচবিহারের কত শ্রমিককে মেরেছে। লজ্জা করে না, সেই বাংলায় দাঁড়িয়ে ভোট চাও। এখন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ফর্ম ফিলাপ করছে। ওটা চিটিং ফাঁক। আপনার নাম, ঠিকানা ফোন নম্বর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিচ্ছে। তোমার এখানে কালো টাকা ঢোকাল। তার পর ইডি, সিবিআই পাঠাবে। রাজবংশীদের এনআরসির নোটিস পাঠাচ্ছে অসম থেকে।’

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট আজ ঐতিহাসিক যে রায় দিয়ে ভোট গ্রহণের দুদিন আগেও ট্রাইবুনাল থেকে ক্লিয়ারেন্স পেলে ভোট দিতে পারবেন বলে জানিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়ে মমতা বলেন, ‘সকলকে অভিনন্দন। দিনহাটা থেকে হেলিকপ্টারে উঠেই আমি সুখবরটা পেলাম। প্রথম থেকে বলে আসছিলাম, সকলে ধৈর্য ধরুন। আমি খুব খুশি। বিচারব্যবস্থার জন্য গর্বিত। আমিই মামলা করেছিলাম। তাই আজ আমার চেয়ে খুশি কেউ নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো, যাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন, প্রথম পর্যায়ের ভোটের অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২১ তারিখ। ভোটের দু’দিন আগেই। ওটা পেলে বুথের সমস্ত কর্মী এবং নেতাদের বলব, সে দিন রাতের মধ্যেই ভোটার স্লিপ তৈরি করে বাড়ি বাড়ি যেন পৌঁছে দেয়। যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা যাতে ভোট দিতে পারেন।’