শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন। নয়াদিল্লি।
সংখ্যার জোরে কেন্দ্রের মসনদে টানা তৃতীয়বার বসার পরও লোকসভায় বড়সড় ধাক্কা খেল মোদি সরকার। বহু আলোচিত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মহিলা সংরক্ষণ ও আসন পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সেটিই শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারল না কেন্দ্র। বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের সামনে সংখ্যার অঙ্কে পিছিয়ে পড়ল বিজেপি।
সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে বিল পাশ করানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিল কেন্দ্র। কিন্তু সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয় সরকার। ৪৮৯ জন সাংসদের উপস্থিতিতে এই বিল পাশ করাতে প্রয়োজন ছিল ৩২৬টি ভোট। সেখানে সরকার পক্ষের ঝুলিতে আসে মাত্র ২৭৮টি ভোট। বিপক্ষে পড়ে ২৩০ ভোট। ফলে বিলটি কার্যত ভেস্তে যায়।
এই বিলের মধ্যে ছিল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব—প্রথমত, লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ; দ্বিতীয়ত, নতুন করে আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন; এবং তৃতীয়ত, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আসন বৃদ্ধি সংক্রান্ত সংশোধন। কিন্তু প্রথম বিলটি পাস না হওয়ায় পরবর্তী দুই প্রস্তাব আর ভোটাভুটির মুখই দেখেনি।
বিরোধীদের ঐক্যই গেমচেঞ্জার
এই ফলাফলের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিরোধীদের একজোট হওয়া। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি থেকে অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি—সবাই একসুরে এই বিলের বিরোধিতা করেছে। লোকসভায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি অভিযোগ করেন, এই বিলের আড়ালে বিজেপি দেশের নির্বাচনী মানচিত্র বদলাতে চাইছে।
রাহুলের কথায়, “সরকার বুঝতে পারছে তাদের রাজনৈতিক জমি দুর্বল হচ্ছে। তাই ডিলিমিটেশনের নামে নতুন করে ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আমরা তা হতে দেব না।”
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও একই সুরে কেন্দ্রকে আক্রমণ করে বলেন, এই বিল আসলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
মমতার আগাম হুঁশিয়ারি, তারপর বাস্তব ফল
এই পরিস্থিতির আঁচ আগেই করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ অধিবেশন ডাকার সিদ্ধান্তের পর থেকেই তিনি বারবার বলেছেন, এই বিল পাস হবে না। এমনকি রাজ্যে জোরকদমে ভোট প্রচার চলা সত্ত্বেও নিজের দলের ২১ জন সাংসদকে দিল্লিতে পাঠান তিনি, যাতে ভোটাভুটিতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়।
ভোটের দিন সকালে মমতা বলেন, “সংবিধান সংশোধন করতে গেলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে। সেটা ওদের নেই। মহিলা সংরক্ষণের সঙ্গে ডিলিমিটেশন জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে উত্তর ভারতের কিছু রাজ্যের আসন বাড়িয়ে দক্ষিণ ভারতের প্রভাব কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের। তার কথায়, “দেশকে টুকরো টুকরো করার চেষ্টা চলছে। একদিন দেখবেন বাংলার জেলাগুলির গুরুত্বই কমে গেছে।”
কেন বিতর্কে মহিলা সংরক্ষণ বিল?
মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, কেন্দ্র এতদিন এই বিল নিয়ে কোনও আগ্রহ দেখায়নি। বরং পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের মাঝেই হঠাৎ করে এই বিল সামনে আনা রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া কিছু নয়।
বিরোধীদের মতে, মহিলা সংরক্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে রেখে আসলে আসন পুনর্বিন্যাসের মতো বিতর্কিত পদক্ষেপকে পাশ করাতে চেয়েছিল কেন্দ্র। কারণ ডিলিমিটেশনের ফলে লোকসভার মোট আসন সংখ্যা বাড়তে পারে, এবং তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে।
সংখ্যার রাজনীতিতে ধাক্কা
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল বিজেপি। কিন্তু এই ভোটাভুটিতে স্পষ্ট হয়ে গেল, সবসময় সংখ্যার জোরই শেষ কথা নয়। বিরোধীরা একসঙ্গে থাকলে সরকারকেও চাপে ফেলতে পারে।
এই ফলাফল রাজনৈতিক মহলে বড় বার্তা দিয়েছে—সংসদের ভেতরে বিজেপির আধিপত্য থাকলেও বিরোধীরা চাইলে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারকে আটকে দিতে সক্ষম।
আগামী দিনে কী?
এই পরাজয়ের পর কেন্দ্র কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার। সরকার কি নতুন করে বিল আনবে, না কি কৌশল বদলাবে—তা স্পষ্ট নয়। তবে একথা পরিষ্কার, ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ—দুটি বিষয়ই আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

অন্যদিকে, এই জয় বিরোধী শিবিরে নতুন অক্সিজেন জুগিয়েছে। লোকসভায় বিজেপিকে হারানোর এই ঘটনা আগামী নির্বাচনী লড়াইয়েও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, সংসদের এই নাটকীয় পর্বে স্পষ্ট—সংখ্যার অঙ্ক যতই শক্তিশালী হোক, রাজনীতির ময়দানে শেষ কথা বলে কৌশল, ঐক্য এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।