নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে মমতার গাড়িতে ইট-গোবর ছোড়ার অভিযোগ, ‘চোর চোর’ স্লোগান ঘিরে তীব্র উত্তেজনা
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে লক্ষ্য করে উঠল চোর চোর স্লোগান। গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হল জুতো। রবিবার দুপুর নাগাদ বেরিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশি হেফাজতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় এক তৃণমূল কর্মীর। দলের সেই কর্মীকেই দেখতে যাচ্ছিলেন তিনি। মমতা ছিলেন গাড়িতে। বরাবরের মতো গাড়ির সামনে বসেছিলেন তিনি। সেই সময় আচমকা বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দোলা সেনও। এখানে উল্লেখ্য, গত ৪ মে-র পর এই প্রথম জেলায় এলেন মমতা। এর আগে নিজের বাড়ির সামনে মিটিং মিছিল করেছিলেন ঠিকই, একবার হাইকোর্ট যাওয়ার পথে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবে, কর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে এই প্রথম পথে নামলেন তিনি। আর তখনই উঠল চোর স্লোগান। বলা হল, ‘ওই দেখো চোর এসেছে…।’ এমনকী, গালিগালাজও করা হয় তাঁকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহত বিরজু কেয়ট এলাকায় তৃণমূলের এক অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জেনি শর্মা কেয়ট উত্তর ২৪ পরগণা কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর। সম্প্রতি হালিশহরের এক স্থানীয় বাসিন্দা বিরজুর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বিরজুর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, এলাকা দখল, হুমকি প্রদান, আর্থিক জালিয়াতি এবং বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র রাখার মতো একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। গত শুক্রবার অভিযুক্তকে ব্যারাকপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে ৫ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন। কিন্তু পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীনই ঘটে বিপত্তি। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, শনিবার সকালে হালিশহর থানার লকআপের ভেতরেই বিরজু আচমকা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তড়িঘড়ি তাঁকে চিকিৎসার জন্য কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। থানা লকআপে বিরজুর মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে তাঁর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। বিরজুর স্ত্রীর অভিযোগ, লকআপে রেখে পুলিশ অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে। পুলিশের বেধড়ক মারধরের চোটেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি সোচ্চার হন। যদিও পুলিশের তরফ থেকে মারধরের সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং জানানো হয়েছে যে অসুস্থতার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই হালিশহর ও কাঁচরাপাড়া সংলগ্ন এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং র্যাফ মোতায়েন করা সত্ত্বেও মানুষের ক্ষোভ দমন করা সম্ভব হয়নি।
রবিবার দুপুরে নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে এবং পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে হালিশহরে পৌঁছান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তিনি এলাকায় প্রবেশ করতেই স্থানীয় বাসিন্দা এবং কতিপয় বিক্ষোভকারী তাঁর কনভয় ঘিরে ধরে। পরিস্থিতি দ্রুত হাতাহাতি ও বিশৃঙ্খলার দিকে মোড় নেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, মমতাকে দেখেই একাংশ মানুষ ‘চোর’ ও ‘চোরদের রানি’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে বোতল ভর্তি জল, নর্দমার কাদা ও জুতো ছুড়ে মারা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ আধিকারিকেরা দ্রুত কর্ডন তৈরি করে তাঁকে সুরক্ষিত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ দিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের গাড়িতে প্রচুর ইঁট ছোড়া হয়েছে। এত ইট মেরেছে কল্পনা করতে পারবেন না। এক ঘণ্টা গাড়ি আটকে রেখেছিল। বিজেপির লোক জোগাড় করে এই সব করানো হয়েছে। যিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি নিজে বাইরে রয়েছেন। পুরো গাড়িতে ইট মারতে মারতে গেছে।’ তাঁর সংযোজন, ‘আমি বেরবোই। বিজেপি ভয় পায় আমায়। এই ভাবে আমায় আটকাতে পারবে না…ওরা ভয় পাচ্ছে কারণ ওদের মুখোশ খুলে যাবে।’
বিক্ষোভকারী এক ব্যক্তি বলেন, ‘এত দিন এই ওয়ার্ডে এসেছেন? বিজ্জুর নাম নিয়েছে কোনওদিন?…কালকে মারা গিয়েছে আজ এসে হাজির।’ অন্যদিকে, বিজেপি বিধায়ক অর্জুন সিং বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শকুনের মতো মৃতদেহ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কালকে ঘটনা ঘটেছে। যদি কোনও এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে অবশ্যই শাস্তি হবে। এখন গোটা বাংলার মানুষ শান্তিতে বাস করছেন তাই চোরকে তো চোরই বলবে।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা অভিযোগ, ‘বিজেপি লুম্পেন বাহিনী নিয়ে এসে আমাদের গাড়ি ঘিরে অশ্রাব্য গালিগালাজ করেছে। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। পুলিশের সামনে আমাদের গাড়িতে বড় বড় পাথর ছোড়া হয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পুলিশ এই ঘটনা ঘটিয়েছে। কালকেও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দু বার কথা হয়েছে। তার পরেও এখানকার বিধায়ক এসে মৃতের স্ত্রীকে হুমকি দিয়ে গিয়েছে যাতে আমার সঙ্গে দেখা না করে। আমরা এই ঘটনা নিয়ে মামলা করব।’
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর আরও অভিযোগ, ‘পুলিশমন্ত্রী নিজে অশান্তি সৃষ্টি করছেন। পুলিশ বিজেপি-র ক্যাডারে পরিণত হয়েছে।’