হিন্দুস্তান পার্কের বহুতলে ভয়াবহ ঘটনা, হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা— দুর্ঘটনা না অন্য কিছু, তদন্তে গড়িয়াহাট থানার পুলিশ
রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
টলিউড যেন আচমকাই থমকে গেল।
যে মানুষটা পর্দায় ব্যঙ্গ, বুদ্ধি আর অন্যরকম গল্প বলার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন, সেই পরিচালক অনীক দত্তর মৃত্যু ঘিরে এখন চরম চাঞ্চল্য কলকাতায়। বুধবার দুপুরে হিন্দুস্তান পার্কের একটি বহুতলের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হল জনপ্রিয় এই পরিচালকের। আর তারপর থেকেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন— এটা কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও রহস্য?
ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা টলিউডে।
হাসপাতাল, আবাসন, থানার বাইরে বিকেল থেকেই ভিড় জমতে শুরু করে। পরিচালক, অভিনেতা থেকে শুরু করে ঘনিষ্ঠ মহল— সকলেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না এই খবর।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার দুপুরে নিজের স্ত্রীর ফ্ল্যাটে এসেছিলেন অনীক দত্ত। হিন্দুস্তান পার্কের ওই অভিজাত বহুতলের ছ’তলার ছাদে কী কারণে উঠেছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিছুক্ষণ পর আচমকাই নিচে পড়ে যান তিনি। স্থানীয়দের দাবি, বিকট শব্দ শুনেই তাঁরা ছুটে আসেন। দেখা যায়, বহুতলের পাশের একটি গাছের ডাল ভেঙে পড়ে রয়েছে। অনুমান, পড়ে যাওয়ার সময় সেই গাছেই ধাক্কা লেগেছিল পরিচালকের।
রক্তাক্ত অবস্থায় দ্রুত তাঁকে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হাসপাতাল সূত্রের খবর, হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মৃত্যু হয়েছিল অনীকের। মাথা, বুক, কাঁধ-সহ শরীরের একাধিক জায়গায় গুরুতর আঘাত ছিল। এমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।
ঘটনার সময় বাড়িতেই ছিলেন পরিচালকের স্ত্রী।
তবে অনীক একা ছাদে উঠেছিলেন, নাকি তাঁর সঙ্গে কেউ ছিলেন— তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে। গড়িয়াহাট থানার একটি বিশেষ দল হাসপাতাল এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। আবাসনের সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, যে জায়গায় অনীক দত্ত পড়ে গিয়েছিলেন, সেই জায়গা ঘিরে ফেলা হয়েছে। ফরেন্সিক টিম নমুনা সংগ্রহ করেছে। রক্তের দাগ, পড়ে থাকা জিনিসপত্র— সব কিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হলেও, অন্য কোনও সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা।
এদিকে হাসপাতাল সূত্রে খবর, আজ আর ময়নাতদন্ত সম্ভব হয়নি। দেহ সংরক্ষণ করে রাখা হবে। বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা। পরিচালকের মেয়ে মুম্বই থেকে কলকাতায় ফিরছেন। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে পৌঁছে যান পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অভিনেতা জিতু কমল-সহ টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখ। অনেকের চোখেই জল। সোশ্যাল মিডিয়াতেও শোকবার্তার বন্যা। কেউ লিখেছেন, “বাংলা সিনেমা এক অসাধারণ গল্পকারকে হারাল।” আবার কেউ বলছেন, “অনীকদার মতো ব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর সিনেমা খুব কম মানুষই বানাতে পারতেন।”
বাংলা ছবির জগতে অনীক দত্তর নাম মানেই ছিল অন্যরকম স্বাদ।
২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ মুক্তির পর রাতারাতি দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। বাংলা সিনেমায় ব্যঙ্গ আর বুদ্ধিদীপ্ত কমেডির নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন অনীক। এরপর একের পর এক ছবি— ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘অপরাজিত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘যত কাণ্ড কলকাতা’— তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের জীবন ও সৃষ্টির অনুপ্রেরণায় তৈরি ‘অপরাজিত’ তাঁকে জাতীয় স্তরেও নতুন পরিচিতি দেয়। সিনেমাপ্রেমীদের একাংশের মতে, অনীক দত্ত ছিলেন সেই বিরল পরিচালক, যিনি একই সঙ্গে বাণিজ্যিক দর্শক ও বুদ্ধিজীবী মহল— দু’দিকেই সমান জনপ্রিয় ছিলেন।
শুধু পরিচালক হিসেবেই নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বও ছিল আলাদা। স্পষ্ট কথা বলা, তীক্ষ্ণ রসবোধ আর সমাজ-রাজনীতি নিয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বরাবর আলোচনায় থাকতেন তিনি। তাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা।
উল্লেখ্য, অনীক দত্ত ছিলেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্র চন্দ্র দত্তর পৌত্র। দীর্ঘ কেরিয়ারে পেয়েছেন একাধিক সম্মান ও পুরস্কার। আনন্দলোক পুরস্কার থেকে শুরু করে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্মান— তাঁর ঝুলিতে রয়েছে বহু স্বীকৃতি।
কিন্তু বুধবারের সেই কয়েক মিনিট যেন সব কিছু ওলটপালট করে দিল।
একজন সফল পরিচালক, যাঁর মাথায় হয়তো আরও অনেক গল্প ছিল, তিনি এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন— তা কেউ ভাবতেও পারেননি।

এখন নজর পুলিশের তদন্তে।
ছাদ থেকে কীভাবে পড়লেন অনীক দত্ত? সেটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে আরও গভীর কোনও রহস্য? উত্তর খুঁজছে টলিউড, উত্তর খুঁজছে কলকাতা। আর সেই উত্তরই হয়তো আগামী কয়েক দিনে আরও বড় চাঞ্চল্য তৈরি করতে পারে।