বিশ্বকাপ অভিযান শুরুতেই হোঁচট। আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন মরক্কোর বিরুদ্ধে কষ্টার্জিত ড্র, প্রশ্ন উঠছে—এই ব্রাজিল কি সত্যিই শিরোপার দাবিদার?
শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে নামার আগেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে ধরা হচ্ছিল ব্রাজিলকে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ডাগআউটে রয়েছেন কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু প্রথম ম্যাচের ৯০ মিনিট শেষে সমর্থকদের মুখে উচ্ছ্বাসের বদলে দেখা গেল উদ্বেগ।
নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে [Brazil National Team] বনাম [Morocco National Team] ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ১-১ ড্র করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সেলেসাওদের। স্কোরলাইন যতটা সমতা দেখাচ্ছে, মাঠের খেলা কিন্তু ততটা নয়। বহু সময়েই মনে হয়েছে, মরক্কোর বিরুদ্ধে এক পয়েন্ট বাঁচানোই যেন ব্রাজিলের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঝড় তোলে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন মরক্কো। প্রথম দশ মিনিটেই একের পর এক আক্রমণে ব্রাজিলের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে তারা। গোলরক্ষক [Alisson Becker] কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ না করলে ম্যাচের ছবি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
অবশেষে ২১ মিনিটে ভেঙেই পড়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। দুর্দান্ত এক থ্রু বল থেকে সুযোগ পান [Ismael Saibari]। মুহূর্তের মধ্যে ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডারকে ছাপিয়ে এগিয়ে গিয়ে আলিসনের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে প্রথম ধাক্কা দেয় মরক্কো।

গোল খাওয়ার পরও ব্রাজিলকে খুব একটা ছন্দে দেখা যায়নি। মাঝমাঠে বলের দখল থাকলেও আক্রমণে ধার ছিল না। ঠিক সেই সময় দলের ত্রাতা হয়ে ওঠেন [Vinicius Junior]।

৩২ মিনিটে নিজের ব্যক্তিগত দক্ষতার ঝলক দেখিয়ে ম্যাচে সমতা ফেরান রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। ব্রুনো গুইমারেসের সঙ্গে দ্রুত পাস বিনিময়ের পর বক্সে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে মরক্কোর গোলরক্ষক [Yassine Bounou]-কে পরাস্ত করেন তিনি। বল সোজা জালের ওপরের কোণায় আশ্রয় নেয়। মুহূর্তের মধ্যে স্টেডিয়ামে ফিরিয়ে আনেন ব্রাজিল সমর্থকদের আশা।
তবে সেই আশাই শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বাস্তব রূপ পায়নি।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ ক্রমশ কৌশলগত লড়াইয়ে পরিণত হয়। দুই কোচই একাধিক পরিবর্তন আনেন। আক্রমণের ঝাঁজ কমে গিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মাঝমাঠে। সেখানে মরক্কোই ছিল বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী।
শেষ ২০ মিনিটে একাধিকবার ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে চাপে ফেলে মরক্কো। কয়েকটি সম্ভাবনাময় সুযোগও তৈরি হয়। কিন্তু আলিসনের দৃঢ়তা এবং কিছুটা ভাগ্য ব্রাজিলকে হার থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। হাকিমির কড়া মার্কিংয়ের মধ্যেও তিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফুটবলার। গোলের পাশাপাশি পুরো ম্যাচে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতেই।
অন্যদিকে [Bruno Guimaraes] আক্রমণে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও তার অতিরিক্ত এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় মাঝমাঠে বড় ফাঁক তৈরি হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বারবার আক্রমণ সাজিয়েছে মরক্কো।
সবচেয়ে হতাশ করেছেন [Raphinha]। বার্সেলোনা তারকাকে ম্যাচজুড়ে প্রায় অচেনা লেগেছে। ডান প্রান্তে তিনি প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হন। এমনকি বক্সের মধ্যে পাওয়া একটি সোনালি সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি।

তবে ব্রাজিল শিবিরের জন্য এখনও সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেয়েও ট্রফি জেতা সম্ভব। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু করেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে—আনচেলত্তির ব্রাজিল কি সেই পথ অনুসরণ করতে পারবে, নাকি প্রথম ম্যাচের এই সতর্কবার্তাই ভবিষ্যতের বড় বিপদের ইঙ্গিত?
পরবর্তী ম্যাচেই মিলবে সেই উত্তর। আর সেখানেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে, এই ব্রাজিল সত্যিই শিরোপার লড়াইয়ে আছে, নাকি শুধুই অতীতের গৌরবের ভার বহন করছে।