দেশজুড়ে নিট পরীক্ষাকে ঘিরে বিতর্ক ও আন্দোলনের আবহে নবান্ন থেকে কৃতী পড়ুয়াদের সংবর্ধনা। স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
দেশজুড়ে NEET বিতর্ক, আর সেই আবহেই বাংলার টপারদের মঞ্চে সম্মান
সারা দেশে যখন NEET পরীক্ষাকে ঘিরে স্বচ্ছতা, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্নে তুমুল আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেল একেবারে অন্য ছবি। বিতর্কের আবহকে সরিয়ে রেখে কৃতিত্বকেই সামনে আনল রাজ্য সরকার।
মঙ্গলবার নবান্ন (নবান্ন, হাওড়া)-র সভাঘরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সর্বভারতীয় NEET পরীক্ষায় সফল প্রথম ১০০ জন কৃতী পড়ুয়াকে সংবর্ধনা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (পশ্চিমবঙ্গ)। প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি করে ল্যাপটপ। শুধু পুরস্কার নয়, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের জন্য ছিল বিশেষ বার্তাও।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই সাফল্য কেবল একজন ছাত্র বা একটি পরিবারের নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের গর্ব। তাঁর কথায়, NEET দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বাংলার ছাত্রছাত্রীরা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা আগামী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
‘শুধু ডাক্তার নয়, মানুষের চিকিৎসক হোন’—আবেগঘন বার্তা
সংবর্ধনা মঞ্চ থেকেই ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের উদ্দেশে আবেগঘন আবেদন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, চিকিৎসা পেশা শুধুমাত্র একটি কর্মজীবন নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক মহান দায়িত্ব।
তিনি কৃতী পড়ুয়াদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, শহরের পাশাপাশি গ্রাম বাংলার মানুষের কাছেও উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে এগিয়ে আসতে হবে। ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ—দুইয়ের প্রতিই সমান দায়বদ্ধ থেকে কাজ করার বার্তাও দেন তিনি।
স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত মন্ত্র ‘চরৈবেতি, চরৈবেতি’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাফল্যই শেষ কথা নয়। নিরন্তর শেখা, এগিয়ে চলা এবং মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করাই প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় রোডম্যাপ তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে ঘিরে মুখ্যমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার রূপরেখা।
তিনি জানান, আগামী কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
তার মধ্যে রয়েছে নিউ টাউন (কলকাতা)-এ প্রস্তাবিত ২০০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল, এসএসকেএম হাসপাতাল (কলকাতা)-এ শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পরিকল্পনা এবং ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত পরিকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, আধুনিক এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ডায়ালাইসিস ইউনিট, এসএনসিইউ, উন্নত অপারেশন থিয়েটার এবং চিকিৎসকদের আবাসনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
চার নতুন মেডিক্যাল কলেজ, বাড়বে MBBS আসনও
চিকিৎসা শিক্ষার সম্প্রসারণ নিয়েও বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, কালিম্পং (পশ্চিমবঙ্গ), আলিপুরদুয়ার (পশ্চিমবঙ্গ), পশ্চিম বর্ধমান (পশ্চিমবঙ্গ) এবং দক্ষিণ দিনাজপুর (পশ্চিমবঙ্গ)—এই চার জেলায় নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে রাজ্যে MBBS আসন সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী যাতে রাজ্যেই চিকিৎসা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান, সেই লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
উত্তরবঙ্গে আরও একটি AIIMS-এর পরিকল্পনার ইঙ্গিত
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কল্যাণী AIIMS (নদিয়া)-এর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও একটি নতুন AIIMS প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে ভাবনা চলছে।
এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহলের একাংশ। যদিও প্রকল্পের সময়সীমা বা বিস্তারিত রূপরেখা নিয়ে এদিন কোনও নির্দিষ্ট তথ্য জানানো হয়নি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বার্তা—’সততাই চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয়’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (পশ্চিমবঙ্গ)। ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন ভালো ডাক্তার হওয়ার জন্য শুধু ভালো ফল করাই যথেষ্ট নয়, পেশার প্রতি সততা এবং রোগীর প্রতি দায়বদ্ধতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে তিনি কৃতী পড়ুয়াদের মানুষের পাশে থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (পশ্চিমবঙ্গ), রাজ্য মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিক, কৃতী পড়ুয়াদের পরিবার এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

রাজনীতির আবহে বার্তার তাৎপর্য
দেশজুড়ে NEET-কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক যখন এখনও থামেনি, সেই সময় কৃতী পড়ুয়াদের সম্মান জানিয়ে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
একদিকে পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে সফল ছাত্রছাত্রীদের সামনে রেখে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য পরিষেবার রূপরেখা—এই দুই বার্তাই এক মঞ্চ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে রাজ্য সরকার।

এখন নজর থাকবে, ঘোষিত স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলি কত দ্রুত বাস্তবের রূপ পায় এবং ভবিষ্যতের এই তরুণ চিকিৎসকেরা সত্যিই বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় লিখতে পারেন কি না। সেই উত্তরই হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।