নিট আন্দোলনের কভারেজে হামলার অভিযোগের পর তীব্র ক্ষোভ, নিরাপত্তা ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব সাংবাদিক সমাজ
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার (Kolkata) ধর্মতলা সোমবার সাক্ষী থাকল এক বিরল প্রতিবাদের। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সহকর্মীদের উপর হামলার অভিযোগে এবার ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর কলম নামিয়ে রাস্তায় নামলেন সাংবাদিকরাই। স্পষ্ট বার্তা—সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যাবে না।
গত শুক্রবার নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় একাধিক সংবাদকর্মী আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার সাংবাদিকদের উদ্যোগে কলকাতা প্রেস ক্লাব (Kolkata Press Club) থেকে ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং ( Dorina Crossing) পর্যন্ত বিশাল প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের হাতে ছিল নানা প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড। কেউ লিখেছেন, “সংবাদ সংগ্রহ অপরাধ নয়”, আবার কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল “Press Freedom Must Be Protected”। ডোরিনা ক্রসিংয়ে পৌঁছে কিছুক্ষণ প্রতীকী অবস্থান বিক্ষোভও করা হয়।
আক্রান্ত সাংবাদিকরা এদিন প্রকাশ্যে জানান, কীভাবে সংবাদ সংগ্রহের সময় তাঁদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। অভিযোগ, কেউ জল ছুড়েছে, কেউ ধাক্কা দিয়েছে, আবার মহিলা সাংবাদিকদের সঙ্গে অশালীন আচরণের ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল।
এই প্রতিবাদে যোগ দিয়ে প্রবীণ সাংবাদিক সন্তোষ দত্তও বলেন, “সাংবাদিকদের উপর হামলা মানে গণতন্ত্রের উপর হামলা।” তাঁর উপস্থিতি তরুণ সাংবাদিকদেরও অনুপ্রাণিত করে।
মিছিল শেষে আক্রান্ত সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল লোকভবনে গিয়ে রাজ্যপাল আর. এন. রবি (governor RN Ravi)-র সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। যদিও রাজ্যপাল উপস্থিত না থাকায় সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। পরে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবারের ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কলকাতায় বাম ছাত্র সংগঠনগুলির ডাকা মিছিল চলাকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপর হামলার অভিযোগ সামনে আসে। সেই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।
হামলার ঘটনার পর আহত সাংবাদিকদের দেখতে হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে জলপাইগুড়ি থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আইন আইনের পথেই চলবে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আপস হবে না।”
অন্যদিকে, আন্দোলনের আয়োজক বাম ছাত্র সংগঠনগুলি একটি বিবৃতিতে ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে। তাদের দাবি, যারা হামলা চালিয়েছে তারা সংগঠনের সদস্য নয় এবং এই ধরনের আচরণকে তারা সমর্থন করে না।
কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police) ইতিমধ্যেই সাংবাদিক ও পুলিশের অভিযোগের ভিত্তিতে ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে। সোমবার ধৃতদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণও করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখছেন।
বিধানসভাতেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছে সরকার। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, মামলার তদন্ত গুরুত্ব সহকারে এগোচ্ছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, এই আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক অবস্থানের নয়; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াই। মাঠে নেমে নির্ভয়ে সংবাদ সংগ্রহ করার পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাঁদের মূল দাবি।

ধর্মতলার প্রতিবাদ আপাতত শেষ হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে—সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন? আর এই ঘটনার তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোন নতুন তথ্য সামনে আনবে? এখন সেই দিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্যের সংবাদমাধ্যম।