কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যে আসছে শত শত নতুন বাস, বাড়ছে কন্ডাক্টরদের বেতন, ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাম পরিষেবা নিয়েও একাধিক বড় পরিকল্পনার কথা জানাল রাজ্য সরকার
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
রাজ্যের গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর বার্তা দিল রাজ্য সরকার। একসঙ্গে ৭০টি নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানিয়ে দিলেন, আগামী কয়েক মাসে শুধু নতুন বাসই নয়, পরিবহণ ব্যবস্থার সামগ্রিক চেহারাই বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। তাঁর ঘোষণা, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলেই আরও ৪০০ বাসের অনুমোদন মিলবে এবং ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে রাজ্য পাবে ১,০০০টি নতুন বাস।
মঙ্গলবার পরিবহণ ভবন (Transport Bhavan), কলকাতা (Kolkata)-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানে 50টি এসি বাসের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকেই তিনি বলেন, “৪০০ বাস চেয়েছেন, টেন্ডার করে দিন। টাকা পেয়ে যাবেন। মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে ১,০০০ বাস আপনাদের হাতে থাকবে।” তাঁর বক্তব্য, আগামী এক বছরের মধ্যেই সাধারণ মানুষ নিজেরাই পরিবহণ ব্যবস্থার পরিবর্তন চোখে দেখতে পারবেন।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন আগের সরকারের পরিবহণ নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, চালকদের বেতন বাড়ানো হলেও কন্ডাক্টরদের বেতন দীর্ঘদিন সংশোধন করা হয়নি। সেই পরিস্থিতি বদলাতে বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগস্ট মাস থেকেই কন্ডাক্টরদের বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
শুধু নতুন বাস নয়, রাজ্যজুড়ে বড় আকারে সরকারি বাস পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। সরকার সূত্রে জানানো হয়, মোট ৪৩৫টি সরকারি বাস ধাপে ধাপে বিভিন্ন জেলায় চালু করা হবে। কলকাতার পাশাপাশি জেলা শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ রুটেও এই বাস চলবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh) জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গণপরিবহণকে আরও আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য করার কাজ চলছে। তাঁর দাবি, অতীতে পরিবহণ দফতরের যে সমস্যাগুলি তৈরি হয়েছিল, সেগুলি দ্রুত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে বর্তমান প্রশাসন।
ট্রাম পরিষেবা নিয়েও বড় ইঙ্গিত দেন পরিবহণমন্ত্রী। তিনি জানান, যে সব রুটে আগে ট্রাম চলত, সেগুলিকে ধাপে ধাপে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar), কালীঘাট (Kalighat) এবং নিউ টাউন (New Town)-এর মতো এলাকায় ভবিষ্যতে ট্রাম পরিষেবা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিবহণমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছে, কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করলে বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তিনি জানান, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ অর্থায়নে আরও ইলেকট্রিক বাস (Electric Bus) আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পে ৬০ শতাংশ অর্থ দেবে কেন্দ্র এবং ৪০ শতাংশ বহন করবে রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে বিভিন্ন ডিপোতে চার্জিং স্টেশন এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির কাজও শুরু হবে।
পরিবহণের পাশাপাশি মেট্রো (Metro Rail) সংক্রান্ত বিষয়েও মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একাধিক অবকাঠামোগত সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে নতুন প্রস্তাবও কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণপরিবহণকে সামনে রেখে এটাই অন্যতম বড় ঘোষণা। বাস, ট্রাম, ইলেকট্রিক যান এবং মেট্রো—সব ক্ষেত্রেই একযোগে বিনিয়োগের বার্তা দিয়ে সরকার জনপরিষেবাকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছে।

তবে ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে। কারণ, নতুন বাস, ট্রাম পুনরুজ্জীবন এবং ইলেকট্রিক অবকাঠামো—সবকিছুই নির্ভর করবে প্রকল্পের গতি ও সময়মতো কাজ শেষ হওয়ার ওপর।
ঘোষণা হয়েছে একাধিক, সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে সরকার। এখন নজর একটাই—মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে সত্যিই কি বদলে যাবে পশ্চিমবঙ্গের গণপরিবহণের চিত্র, নাকি আরও অপেক্ষা করতে হবে যাত্রীদের?