ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র ও অনিয়মের অভিযোগের আবহে রাজ্যের বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। মুখ্যসচিবের নির্দেশে বদলে গেল জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তির কাঠামো, জেলায় জেলায় শুরু হচ্ছে কড়া নজরদারি।
প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা (পশ্চিমবঙ্গ): জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র তৈরি থেকে শুরু করে নথিভুক্তিকরণের পুরো ব্যবস্থাতেই এবার বড় প্রশাসনিক রদবদল। রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশিকা জারি হতেই বদলে গেল বহু বছরের প্রচলিত কাঠামো। এবার থেকে প্রতিটি জেলার জেলাশাসক (DM & Collector)-ই হবেন সংশ্লিষ্ট জেলার District Registrar of Births and Deaths। একই সঙ্গে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানদের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) চলাকালীন জন্ম শংসাপত্র নিয়ে অনিয়ম, জালিয়াতি ও ভুয়ো নথির অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে অনেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, গ্রাম পঞ্চায়েত (West Bengal Panchayat) এলাকায় আর কোনও প্রধান (Pradhan) জন্ম বা মৃত্যু নথিভুক্তির Sub-Registrar থাকবেন না। তাঁদের সেই দায়িত্ব অবিলম্বে বাতিল করা হয়েছে। পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক (DM) পঞ্চায়েত সচিব অথবা অন্য কোনও সরকারি আধিকারিককে Registrar হিসেবে নিয়োগ করবেন।
শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী BMOH, গ্রামীণ হাসপাতালের সুপার, জেলা হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল, স্টেট জেনারেল হাসপাতাল এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের MSVP-দের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও মৃত্যু নথিভুক্তির Registrar হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক স্তরেও নতুন দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। ADM, SDO, BDO এবং কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation)-র Joint Municipal Commissioner-দের Additional District Registrar হিসেবে নিযুক্ত করা হবে।
পুরসভাগুলিতেও পুরনো ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এতদিন যেখানে চেয়ারম্যান, এক্সিকিউটিভ অফিসার বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এই দায়িত্ব পালন করতেন, সেখানে এবার সরকারি আধিকারিকদের Registrar হিসেবে নিয়োগ করা হবে। কলকাতা পুর এলাকায় অবশ্য Municipal Commissioner-ই District Registrar হিসেবে থাকবেন এবং তাঁর হাতেই থাকবে Registrar নিয়োগের ক্ষমতা।
এই নতুন গাইডলাইন জারি করেছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল (West Bengal Chief Secretary)।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে জানান, ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR) চলাকালীন প্রশাসনের হাতে একাধিক অভিযোগ এসেছে। বিভিন্ন জায়গায় জন্ম শংসাপত্রে অনিয়ম, ভুল তথ্য এবং ভুয়ো নথির অভিযোগ ধরা পড়েছে। সেই কারণেই গোটা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যসচিবের কথায়, “নিয়ম থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে জালিয়াতি করে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনওভাবেই কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও জানান, জন্ম শংসাপত্র যাচাই কোনও বিশেষ অভিযান নয়, এটি প্রশাসনের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। তবে সাম্প্রতিক অভিযোগের জেরে এবার সেই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই যাচাইয়ের কাজ শুধুমাত্র সরকারি কর্মীরাই করবেন। কোনও চুক্তিভিত্তিক কর্মী বা বেসরকারি সংস্থাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে না।
প্রশাসনের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে জন্ম ও মৃত্যু নথিভুক্তিকরণে জবাবদিহি যেমন বাড়বে, তেমনই ভুয়ো নথি তৈরির সুযোগও অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিষেবা যাতে দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশও মনে করছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় উঠে আসা অভিযোগের পর এই প্রশাসনিক পুনর্গঠন ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারির ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও সাধারণ মানুষের জন্য পরিষেবা পেতে কোনও অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

এখন নজর একটাই—নতুন এই নির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার পর জন্ম ও মৃত্যু নথিভুক্তির ব্যবস্থায় কতটা স্বচ্ছতা আসে, আর ভুয়ো শংসাপত্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান কতটা কঠোর হয়। আগামী দিনে তারই উত্তর মিলবে।