পরপর দু’দিনের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর নতুন মোড়। বিজেপির পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ আনলেন স্বাধিকারভঙ্গের নোটিস। পাল্টা বিস্ফোরক বার্তা কুণাল ঘোষের—”আমাকে বলতে দেওয়া হচ্ছে না, এ লড়াই থামবে না।”
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা (বিধানসভা) যেন টানা দু’দিন ধরে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। বুধবারের নাটকীয় সাসপেনশন, মার্শালদের হস্তক্ষেপের পর বৃহস্পতিবার আরও এক ধাপ এগোল বিতর্ক। এবার কুণাল ঘোষ (তৃণমূল কংগ্রেস)-এর বিরুদ্ধে স্বাধিকারভঙ্গের নোটিস আনলেন বিজেপির পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ (বিধানসভা)। আর সেই নোটিস ঘিরেই ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গন।
ঘটনার পরই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে কুণাল ঘোষ বলেন, তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, বিধানসভার ভিতরে বারবার তাঁর কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলছে। এমনকি প্রয়োজনে তাঁর বিধায়ক পদও কেড়ে নেওয়া হতে পারে বলেই ইঙ্গিত করেন তিনি।
কুণাল ঘোষের কথায়, “আমি পরিষ্কার বলছি, আমাকে কোনও ডিবেটে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবাদ করলেই মার্শাল দিয়ে বের করে দেওয়া হচ্ছে। যদি প্রিভিলেজ মোশন এনে আমার বিধায়ক পদ কেড়ে নিতে চান, নিয়ে নিন। কিন্তু আমার বক্তব্য বন্ধ করানো যাবে না।”
এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বিরোধীদের একাংশের দাবি, বিধানসভার শৃঙ্খলা রক্ষা করতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কুণাল ঘোষের বক্তব্যকে ঘিরে তৃণমূলের অন্দরের সমীকরণ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বুধবারের অধিবেশনেই প্রথম বড় বিতর্কের সূত্রপাত। কে বক্তব্য রাখবেন, তা নিয়ে আখরুজ্জামান (তৃণমূল বিধায়ক)-এর সঙ্গে কুণাল ঘোষের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, অধিবেশনের মধ্যেই মার্শালদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরে তাঁকে এক দিনের জন্য সাসপেন্ড করেন বিধানসভার স্পিকার (পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা)।
কিন্তু সেখানেই বিতর্ক থেমে থাকেনি।
বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই বুধবারের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলতে চেয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (তৃণমূল কংগ্রেস)। তবে স্পিকার সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। এরপরই স্পিকার বুধবারের ঘটনাকে “কলঙ্কজনক” বলে উল্লেখ করেন। সেই মন্তব্য ঘিরেই ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে অধিবেশন কক্ষে।
স্পিকারের মন্তব্যের পরই সরব হন কুণাল ঘোষ। তাঁর প্রতিবাদের মাঝেই ওয়েলে নেমে আসেন বিজেপি বিধায়কেরা। শুরু হয় তীব্র বাকবিতণ্ডা। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শঙ্কর ঘোষ-সহ একাধিক বিজেপি বিধায়ক স্পিকারের টেবিলের সামনে চলে আসেন। কুণাল ঘোষও স্পিকারের ডেস্কের কাছাকাছি পৌঁছে যান। কয়েক মিনিটের জন্য কার্যত অচল হয়ে পড়ে অধিবেশন।
এই ঘটনার পরই বিজেপির তরফে কুণাল ঘোষের বিরুদ্ধে স্বাধিকারভঙ্গের নোটিস আনা হয়। যদিও নোটিসের পরবর্তী প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে বিষয়টি যে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
এদিকে বিধানসভার অন্দরের সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরুর আগে কুণাল ঘোষ ও আখরুজ্জামানের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তাও হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম (তৃণমূল কংগ্রেস) এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। সূত্রের দাবি, কুণাল ঘোষ আখরুজ্জামানকে বলেন, তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কোনও ক্ষোভ নেই। তাঁর একমাত্র দাবি, বিধানসভায় তাঁকে নিজের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হোক।
এই ঘটনাপ্রবাহে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত সংঘাত বা বিধানসভার শৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিধানসভার কার্যপ্রণালী, বিরোধী ও শাসক শিবিরের সংঘাত এবং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার লড়াইও।

স্বাধিকারভঙ্গের নোটিস কতদূর গড়ায়, কুণাল ঘোষের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, কিংবা তিনি আবারও একই অবস্থানে অনড় থাকেন কি না—সেই দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। বিধানসভার এই টানটান পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও কোন দিকে মোড় নেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।