যন্তর মন্তরে উল্লাসে ফেটে পড়ল আন্দোলনকারীরা। কেন্দ্রের দ্রুত সিদ্ধান্তে নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী। আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা ককরোচ জনতা পার্টির।
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
দীর্ঘ ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনের পর অবশেষে এল সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। দেশের রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে পড়ুয়াদের মধ্যে শনিবারের ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল চর্চা। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের সরে দাঁড়ানোর খবর প্রকাশ্যে আসতেই দিল্লির (যন্তর মন্তর) আন্দোলন মঞ্চে শুরু হয় উচ্ছ্বাস। আর সেই আবেগঘন মুহূর্তেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ অভিজিৎ দীপ দাবি করেন, “এটা শুধুই একজন মন্ত্রীর ইস্তফা নয়, এটা গণতন্ত্রের জয়।”
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে (দিল্লি) জুড়ে চলা ছাত্র-যুব আন্দোলন শনিবার নতুন মোড় নেয়। আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল (NEET Paper Leak) ইস্যু এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবি। সেই দাবিকে সামনে রেখেই ককরোচ জনতা পার্টি এবং বহু ছাত্র-যুব সংগঠন ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল।
শনিবার দুপুরে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার খবর পৌঁছতেই যন্তর মন্তরে উপস্থিত আন্দোলনকারীদের মধ্যে শুরু হয় উদযাপন। কেউ একে ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলছেন, কেউ আবার এটিকে দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল বলে দাবি করছেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে শান্তিপূর্ণ ও ধারাবাহিক আন্দোলনের শক্তিকে কখনও হালকাভাবে দেখা উচিত নয়।
অভিজিৎ বলেন, “যদি মানুষ ভয় না পায়, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে, তাহলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই বড় পরিবর্তন সম্ভব। আমরা চেয়েছিলাম মেধাবী পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হোক। সেই লক্ষ্যেই এই আন্দোলন।”
এই মন্তব্যের পরই আন্দোলন মঞ্চে করতালিতে ফেটে পড়েন উপস্থিত ছাত্র-যুবরা। বহু আন্দোলনকারীর চোখেও জল দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। আন্দোলনের শেষ দিনের আবহ ছিল আবেগ, স্বস্তি এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় ভরপুর।
এদিকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্র বড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর ইস্তফাপত্র গ্রহণ করার পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রহ্লাদ যোশীকে [(Prahlad Joshi)]। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় ক্রেতা সুরক্ষা, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন। দ্রুত এই দায়িত্ব পরিবর্তনকে কেন্দ্রের তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
এই ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবও। ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিকে ঘিরে বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা সরব হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখেন বিরোধী নেতারা। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কেন্দ্রের একাধিক দফা বৈঠকও হয়।
শনিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা [(JP Nadda)] এবং জিতেন্দ্র সিং [(Jitendra Singh)]-এর সঙ্গে তৃতীয় দফা বৈঠকের কথা ছিল ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিদের। তবে সেই বৈঠকের আগেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার খবর সামনে আসে। এরপর নির্ধারিত বৈঠকে অংশ নেন সংগঠনের মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা। বৈঠকে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এবং আন্দোলনের বিভিন্ন দাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।
ককরোচ জনতা পার্টির দাবি, শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, তাঁদের উত্থাপিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক আশ্বাস মিলেছে। সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি প্রত্যাহার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার জেরে আত্মহত্যা করা ছাত্রছাত্রীদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার বিষয়েও কেন্দ্র নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই ঘোষণার পরই আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যন্তর মন্তরের আন্দোলন মঞ্চ থেকে সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মী-সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা অবস্থান কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলেই দাবি সংগঠনের নেতৃত্বের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং যুবসমাজের প্রত্যাশা নিয়ে কেন্দ্রের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী রাজনীতিতেও এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত আন্দোলনের সমস্ত দাবি নিয়ে বিস্তারিত সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে রাজনৈতিক ও শিক্ষামহলে।


একদিকে নতুন শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নিলেন, অন্যদিকে আন্দোলন আপাতত থামল। কিন্তু এতদিনের আন্দোলনের পরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সত্যিই কি বড় পরিবর্তন আসবে? নাকি এখান থেকেই শুরু হবে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়—এবার সেই দিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।