সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
পাটনার এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে বিচারাধীন বন্দি চন্দন মিশ্রকে গুলি করে খুন করার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়ায় সারা দেশে। ঘটনার পর থেকেই বিহার পুলিশের তদন্তে উঠে আসে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য—ঘাতকরা বাংলা, কলকাতার নিউ টাউনে আশ্রয় নিয়েছে! অবশেষে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যৌথ অভিযান চালিয়ে নিউ টাউনের এক আবাসন থেকে পাঁচ দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করা হয়।
কী হয়েছিল পাটনায়?
ঘটনা ঘটে পাটনার পরশ হাসপাতালের আইসিইউ-তে। চিকিৎসার জন্য প্যারোলে ছাড়া পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কুখ্যাত বন্দি চন্দন মিশ্র। সেই সময় পাঁচজন দুষ্কৃতী হঠাৎ আইসিইউ-তে ঢুকে গুলি চালায় ও তাকে খুন করে পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয় এবং গোটা দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বাংলায় কীভাবে এল দুষ্কৃতীরা?
সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল টাওয়ার ট্র্যাকিংয়ের সূত্র ধরে বিহার পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্তরা পশ্চিমবঙ্গের নিউ টাউনে লুকিয়ে রয়েছে। এরপর শুক্রবার রাতে বিহার পুলিশের একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম কলকাতায় আসে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স-এর সঙ্গে সমন্বয় করে শনিবার ভোরে অভিযান চালিয়ে নিউ টাউনের একটি আবাসন থেকে পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
তৌসিফ বাদশা — মূলচক্রী?
পুলিশের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের মূলচক্রী হল তৌসিফ রাজা ওরফে তৌসিফ বাদশা। পাটনা পুলিশ সূত্রে খবর, তৌসিফের বাড়ি ফুলওয়ারি শরিফের গুলিস্তান কলোনিতে। তবে সে আদতে বক্সারের বাসিন্দা। তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফুলওয়ারি শরিফের দুর্গা মন্দির এলাকায় চলতি বছরের রমজানের সময় একটা শুটআউটের ঘটনাতেও তার নাম জড়ায়। পুলিশ সূত্রে খবর, পাটনার একটি নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছেন তৌসিফ। তার মা-ও একজন শিক্ষিকা। বাবা একজন ব্যবসায়ী। তবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েই অপরাধের দুনিয়ায় পা রাখে। সবসময় নিজেকে চর্চার মধ্যে রাখতে পছন্দ করে। অল্প সময়ে পরিচিত হওয়ার লক্ষ্যে অপরাধজগতকে বেছে নেয়। শুরু হয় তার অপরাধ দুনিয়ায় সফর। সুপারি নিয়ে খুন করার কাজ শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের একটি ‘গ্যাং’ বানায়। মূলত অল্পবয়সি ছেলেদের নিজের দলে নেওয়া শুরু করে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়। টাকার বিনিময়ে খুন করা, খুনের জন্য নানারকম সহযোগিতা করে সে।
কেন খুন করা হল চন্দনকে?
তদন্তে জানা গিয়েছে, চন্দন মিশ্র একসময় তৌসিফের গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পর্কে পুলিশের কাছে তথ্য দিয়েছিল। সেই আক্রোশ থেকেই এই খুনের পরিকল্পনা হয়। পুরুলিয়া জেলে বন্দি শেরু সিং নামক এক কুখ্যাত গ্যাংস্টারও এই ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
বিহার পুলিশের উচ্চপদস্থ এক কর্তা জানান, পাটনার সগুনা মোড় ও ভোজপুরে সোনার দোকানে ডাকাতির ঘটনায় নিহত চন্দনের গ্যাং জড়িত ছিল। চন্দন পুলিশের কাছে ওই গ্যাংয়ের দুষ্কৃতীদের সম্পর্কে খবরাখবর দিয়েছিল। সেই আক্রোশেই তাকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। চন্দন বিরুদ্ধে একাধিক খুনের মামলা ছিল। এক ব্যবসায়ীকে খুনের দায়ে তার যাবজ্জীবন জেল হয়। সে বেউর জেলে ছিল। লিভারের সমস্যা হওয়ায় চন্দনকে প্যারোলে ছাড়া হয় হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা করানো জন্য। তার প্যারোলের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৮ জুলাই। ইতিমধ্যেই চন্দন মিশ্র খুনে পৃথক ২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। চন্দন মিশ্রের বাবা মন্টু মিশ্রের অভিযোগের ভিত্তিতে পাটনার শাস্ত্রীনগর থানায় একটি মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। তাতে বলবন্ত, মনু এবং তৌসিফ রাজা ওরফে বাদশার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য মামলা দায়ের হয়েছে গুলিবিদ্ধ দুর্গেশের অভিযোগের ভিত্তিতে।

নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
এই ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। বিজেপি নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বিহারের দুষ্কৃতীরা কেন বারবার বাংলায় আশ্রয় নিচ্ছে? বাংলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এত দুর্বল কেন?”
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে বলেন, “রাজ্যে কোনও আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। তাই যে কোনও অপরাধীদের মাথা গোঁজার জায়গা হয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দুষ্কৃতিরা ভাবে এখানে তাঁদের সরকারই রয়েছে। এটা কোনও অপরাধীকে নিয়ে কথা হচ্ছে না কিংবা বিহার নিয়েও কথা হচ্ছে না। এই রাজ্যেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গারা ধরা পড়ছে। জঙ্গিদের এখান থেকে ধরা হচ্ছে। রাজ্য সরকার বলে এথানে কিছু নেই।”