বিদ্যুৎ বিল শূন্যের কাছাকাছি! ছাদে সোলার প্যানেল বসালেই মিলতে পারে সরকারি অনুদান, ঋণ ও বাড়তি আয়ের সুযোগ—জেনে নিন কারা পাবেন সুবিধা
গরম পড়তেই বাড়ছে বিদ্যুতের ব্যবহার, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মাসিক বিদ্যুৎ বিল। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তির খবর সামনে এল। কেন্দ্রীয় সরকারের বহুচর্চিত পিএম সূর্য ঘর যোজনা (PM Surya Ghar Yojana) এবার রাজ্যজুড়ে আরও জোরদারভাবে বাস্তবায়নের পথে। ফলে হাজার হাজার পরিবারের সামনে খুলে যেতে পারে কম খরচে বা প্রায় বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার নতুন দরজা।
রাজ্যের বিভিন্ন জনকল্যাণ শিবিরে ইতিমধ্যেই এই প্রকল্প নিয়ে আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন একটাই—কীভাবে মিলবে এই সুবিধা? কারা আবেদন করতে পারবেন? আর সত্যিই কি মাসে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে পাওয়া সম্ভব?
কী এই PM Surya Ghar Yojana?
২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এই উচ্চাভিলাষী সৌরশক্তি প্রকল্প চালু করে। মূল লক্ষ্য, দেশের ১ কোটি পরিবারের ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম বসানো এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি করা।
এই প্রকল্পে বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে বিদ্যুৎ সংস্থার উপর নির্ভরতা কমে এবং মাসিক বিল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। অনেক ক্ষেত্রে বিল প্রায় শূন্যেও নেমে আসতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে ২৬ লক্ষেরও বেশি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় এসেছে। এবার পশ্চিমবঙ্গেও প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিল কমবে কতটা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৩০০ ইউনিট বা তার কম, তারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন। কারণ সোলার সিস্টেম থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ফলত মাসের শেষে বিদ্যুৎ বিলের অঙ্ক অনেকটাই কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবারের আর্থিক সাশ্রয়ের অন্যতম বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন শক্তি বিশেষজ্ঞরা।
৭৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি!
প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকি।
২ কিলোওয়াট পর্যন্ত সোলার সিস্টেম বসানোর ক্ষেত্রে মোট খরচের বড় অংশে আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়। আর ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সিস্টেমের জন্য সর্বাধিক ৭৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও রুফটপ সোলার আর বিলাসিতা নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠছে।
শুধু সাশ্রয় নয়, আয়ও হতে পারে!
এই প্রকল্পের আরও একটি বড় সুবিধা রয়েছে। আপনার সোলার প্যানেল যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তাহলে সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে পাঠানো সম্ভব।
নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই বিদ্যুতের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, শুধু বিদ্যুৎ বাঁচানো নয়, ভবিষ্যতে বাড়তি আয়ের পথও খুলে যেতে পারে।
এছাড়াও ৩ কিলোওয়াট পর্যন্ত সিস্টেম স্থাপনের জন্য স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণের সুবিধাও রয়েছে, যা প্রাথমিক খরচের চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করতে হলে কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
– আবেদনকারীকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
– নিজের নামে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকতে হবে।
– এমন বাড়ি থাকতে হবে, যেখানে ছাদে সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব।
– প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে।
কীভাবে করবেন আবেদন?
আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইন।
প্রথমে নির্দিষ্ট জাতীয় পোর্টালে গিয়ে রাজ্যের নাম, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা, গ্রাহক নম্বর, মোবাইল নম্বর ও ই-মেল আইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার পর নিবন্ধিত বিক্রেতার মাধ্যমে সোলার সিস্টেম বসানো যাবে। পরিদর্শন ও নেট মিটার সংক্রান্ত কাজ সম্পূর্ণ হলে ভর্তুকির টাকা সরাসরি আবেদনকারীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সরকারি সূত্রের দাবি, সমস্ত নথি যাচাইয়ের পর সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভর্তুকি মঞ্জুর করা হয়।
বিদ্যুতের বাড়তি খরচে যখন নাজেহাল সাধারণ মানুষ, তখন এই প্রকল্প অনেক পরিবারের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—রাজ্যের কত লক্ষ পরিবার বাস্তবে এই সুযোগের আওতায় আসতে পারবে, আর বাংলায় সৌর বিপ্লবের সূচনা কতটা দ্রুত হয়, সেটাই এখন দেখার।