সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘মোদীবাবু, অমিত শাহ, জ্যোর্তিময় সিং মাহাতো – যাঁরা আজ বড় বড় ভাষণ দেন, ২০১১ সালের আগে পুরুলিয়ার মাটিতে তাঁদের টিকিটা খুঁজে পাওয়া যেত না। আজ এসে শান্তি-শৃঙ্খলার কথা বলছেন!’ এভাবেই আজ পুরুলিয়ার রণসংকল্প সভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না থাকলে আজও মাওবাদী-সিপিএমের বোমা-বন্দুকের নীচে মাথা নিচু করেই বাঁচতে হত!’
২০১১ সালের আগে সিপিএমের যে সমস্ত হার্মাদরা বাংলায় নির্যাতন অত্যাচার করত তারাই এখন বিজেপির পতাকার নিচে চলে এসেছে বলে তীব্র কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, পুরুলিয়ায় যাঁরা বাম ছিলেন, তাঁরাই এখন বিজেপি। ট্রাফিক সিগন্যালের উদাহরণ টেনে অভিষেক বলেন, ‘লাল মানে থামো, গেরুয়া মানে ধীরে চলো, আর সবুজ মানে এগিয়ে চলো।’ বাম আমলের ‘হার্মাদ’দেরই এখন বিজেপির ‘জল্লাদ’ বলে কটাক্ষ করে তাঁর মন্তব্য, ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ।’ নিজের দাবির স্বপক্ষে একাধিক প্রাক্তন সিপিএম নেতার নামও উল্লেখ করেন তিনি, যাঁরা বর্তমানে বিজেপির নেতৃত্বে। সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর আবেদন, ‘তৃণমূলের কোনও স্থানীয় পদাধিকারী খারাপ আচরণ করলে এক ফোনে অভিষেকে ফোন করে জানাবেন। কিন্তু তার জন্য তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাবেন না।’
এর পরেই পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোর্তিময় সিং মাহাতকে সরাসরি নিশানা করেন অভিষেক। মোদী সরকারের ১১ বছরে সাংসদ হিসেবে এলাকার জন্য কী উন্নয়ন হয়েছে—সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিশেষ করে রেলের হালচাল নিয়েও কটাক্ষ করেন। চক্রধরপুর এক্সপ্রেস, পুরুলিয়ার এক্সপ্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলির নিয়মিত ৮-১০ ঘণ্টা দেরিতে চলার প্রসঙ্গ তুলে অভিষেক বলেন, ‘একটা ট্রেনই যদি সময়ে হাওড়া পৌঁছাতে না পারে, তা হলে এত বছরে সাংসদ কী করলেন? ট্রেন লেটের সমস্যা নিয়েও যাঁর কোনও উদ্যোগ নেই, তিনি নাকি উন্নয়নের কথা বলবেন?’ একই সঙ্গে অভিষেক বলেন, নির্বাচনের তিনমাসের মধ্যে পুরুলিয়ায় এই ট্রেনের লেট রান আমরা বন্ধ করবই। রাত ১০টার ট্রেনে পরের দিন ভোরে পৌঁছবে, এ জিনিস বরদাস্ত করব না।
এদিন ফের কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে ফের সরন হন অভিষেক। শুধু তাই নয়, তৃণমূল সরকারের কর্মকাণ্ড নিতেও বার্তা দিয়েছেন। বাংলার টাকা কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আটকে রেখেছে। পুরুলিয়ার ৬৮০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে কেন্দ্রের কাছে। সেই টাকা পেলে এই জেলায় আরও উন্নয়ন হতে পারত। সেই কথা জানিয়েছেন অভিষেক। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে একশো দিনের কাজের টাকা থেকে এসআইআর ইস্যুতে বাংলা চ্যালেঞ্জ করেছিল। তৃণমূল সরকার প্রথমে একশো দিনের কাজের পাওনা টাকার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে বকেয়া মেটানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এসআইআর ইস্যুতেও রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। সেই মামলাতেও রাজ্যের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বাংলায় মানুষের এই জয়। এমনই বার্তা দিয়েছেন অভিষেক।
আসন্ন বিধানসভা ভোটে জেলার ৯টি বিধানসভা আসনে বিজেপিকে ‘শূন্য’ করার ডাক দেন অভিষেক। জানান, এক মাস পর আবার পুরুলিয়ায় আসবেন। যে অঞ্চলে যেতে বলা হবে, সেখানেই যাবেন। পাশাপাশি, যাঁরা তৃণমূলকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের ভোটের মাধ্যমেই শিক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।চতুর্থবারের তৃণমূল সরকার গঠনে পুরুলিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অভিষেক বলেন, ‘আমি এক কথার ছেলে। জানি এখানকার মানুষের অনেক দাবি এখনও পূরণ হয়নি। তবে কথা দিয়ে যাচ্ছি, পুরুলিয়ার সব আসনে তৃণমূল জিতলে ৬ মাসের মধ্যে আপনাদের সব দাবি পূরণের চেষ্টা করব।’
এখানেই না থেমে ভোটের সময় বিজেপি টাকা দিতে এলে কী করতে হবে, তাও বাতলে দেন অভিষেক। সভায় উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে বলেন, ‘ভোটের সময় বিজেপি টাকা দিতে এলে দর কষাকষি করবেন! এক হাজার টাকা দিতে এলে ১০ হাজার চাইবেন। পদ্ম ফুল থেকে টাকা নিয়ে জোড়া ফুলে ভোট দিন, যাতে ভোট বাক্স খুললে ওরা চোখে সর্ষে ফুল দেখে!’