রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায় ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। একটি পরকীয়ার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে প্রেমিকার স্বামীকে নথির অজুহাতে বাড়িতে ডেকে এনে খুন করার অভিযোগ উঠেছে এক বুথ লেভেল অফিসারের (বিএলও) বিরুদ্ধে। শুধু খুনই নয়, প্রমাণ লোপাট করতে দেহ টুকরো করে খাল ও জলাশয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় স্তম্ভিত গোটা এলাকা।
ঘটনার সূত্রপাত ৯ ফেব্রুয়ারি। বছর আটত্রিশের নাসির মণ্ডল নামে এক যুবককে ফোন করে ডেকে পাঠান এলাকার বিএলও রিজওয়ান হাসান ওরফে মন্টু। অভিযোগ, এসআইআর সংক্রান্ত কিছু নথি দেওয়ার কথা বলে তাঁকে বাড়িতে আসতে বলা হয়। পরিবারের দাবি, নথি নিতে বেরোনোর পর থেকেই নাসিরের আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন, ১০ ফেব্রুয়ারি, একটি খাল থেকে উদ্ধার হয় নাসিরের মোটরবাইক। কাছেই পড়েছিল তাঁর জুতো। কিন্তু মানুষটির কোনও হদিস মেলেনি। ধীরে ধীরে সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। নাসিরের পরিবার সরাসরি অভিযোগ তোলে ওই বিএলও-র বিরুদ্ধে এবং থানায় অপহরণের অভিযোগ দায়ের করে।
পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ করে। শুক্রবার রিজওয়ান হাসানকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। আর তার পরেই তদন্তে আসে বড় মোড়।
শনিবার বাদুড়িয়া পাপিলা এলাকার বিভিন্ন খাল ও জলাশয় থেকে উদ্ধার হয় একাধিক প্লাস্টিকের ব্যাগ। তার ভিতর ছিল মানুষের দেহাংশ। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেগুলো নিখোঁজ নাসির মণ্ডলের দেহের অংশ। এই ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।
পুলিশি জেরায় রিজওয়ান যে তথ্য দিয়েছেন, তা আরও চাঞ্চল্যকর। সূত্রের খবর, নাসিরের স্ত্রী বিউটি খাতুনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত ছিলেন তিনি। সম্প্রতি সেই সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। দাম্পত্য অশান্তি শুরু হয় নাসিরের পরিবারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিউটি কিছুদিনের জন্য রিজওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অভিযুক্ত বিএলও। তাঁর রাগ গিয়ে পড়ে প্রেমিকার স্বামীর উপর। তদন্তকারীদের অনুমান, সেই ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পনা করেন খুনের। নথির নাম করে ডেকে এনে নাসিরকে ফাঁদে ফেলেন তিনি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই দিন আগে থেকেই পরিকল্পনা করা ছিল সবকিছু। রিজওয়ানের সঙ্গে ছিলেন সাগর গাইন নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ, সাগরকে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে সুপারি দেওয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট জায়গায় নাসির পৌঁছতেই তাঁকে আক্রমণ করা হয়। এরপর খুন করে দেহ টুকরো টুকরো করা হয়, যাতে শনাক্ত করা কঠিন হয়।
দেহাংশ ছোট ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে বাদুড়িয়া এলাকার বিভিন্ন খাল ও জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল প্রমাণ লোপাট করা এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
পুলিশ ইতিমধ্যেই সাগর গাইনকেও গ্রেফতার করেছে। জানা গিয়েছে, প্রতিশ্রুত সম্পূর্ণ অর্থ তিনি পাননি। খুনের পর কিছু টাকা হাতে এলেও পুরো সুপারি মেটানোর আগেই পুলিশের জালে ধরা পড়েন দু’জনেই।
বসিরহাট পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার হোসেন মেহেদি রহমান জানিয়েছেন, অভিযুক্ত জেরায় খুনের কথা স্বীকার করেছেন। তবে তদন্ত এখনও চলছে। আরও কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে সরকারি দায়িত্বে থাকা এক কর্মীর নৈতিকতা নিয়ে। একজন বিএলও, যাঁর কাজ ভোটার তালিকা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো, তিনি কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে এমন নৃশংস অপরাধে জড়িয়ে পড়লেন, তা ভাবিয়ে তুলছে অনেককেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, নাসির শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাঁর এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না পরিবার ও প্রতিবেশীরা। বিউটি খাতুনের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে, যদিও পুলিশ এখনও পর্যন্ত তাঁকে অভিযুক্ত করেনি।

বাদুড়িয়ার এই ঘটনা আবারও সামনে আনল পরকীয়া, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং পরিকল্পিত অপরাধের ভয়াবহ দিক। একটি সম্পর্কের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল একটি প্রাণ, ভেঙে দিল একটি পরিবার।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন খুনের আগে-পরে মোবাইলের কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য প্রমাণ। ফরেনসিক রিপোর্টও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘Baduria BLO murder case’ এখন শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়, বরং প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ ও জবাবদিহি নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে আরও গ্রেফতার হতে পারে।
এখন দেখার, আদালতে কীভাবে এগোয় এই বহুচর্চিত মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত দোষীদের কী শাস্তি হয়।