সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত শিল্প বাণিজ্য সম্মেলনে এল বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। বৃহস্পতিবার কলকাতার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চে কলকাতা তথা দেশের প্রথম সারির শিল্পপতি এবং শিল্প গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের কথায় উঠে এলো বাংলায় বিনিয়োগের আদর্শ পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা।
মঞ্চ থেকে মমতা বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আমি সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। তখন দেখেছিলাম চারপাশে বাংলার এমন একটা ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে যে বাংলা কিছুই করতে পারবে না। চারপাশে রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাংলা আসলে একটা লস্ট কেস। বাংলা কিছুই করছে না, করার ক্ষমতাই নেই, সব গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। দেখলাম সবাই শুধু বাংলার বদনামই করছে। বাংলায় শিল্প সম্ভাবনা নেই বলে রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই দিন থেকেই আমি একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম বাংলাও একদিন বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে।’
বাংলাকে ভারত সেরা তথা বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে এদিনের বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চে উঠেই গত ১৫ বছর ধরে কোন রাস্তায় রাজ্য বিনিয়োগ করে চলেছেন সেই খতিয়ান তুলে ধরেন আরপিএসজি গ্রুপের চেয়ারম্যান সঞ্জীব গোয়েঙ্কা। মঞ্চে উঠেই বলেন, ‘গত ১৫ বছরে ২৬৫০০ কোটি টাকা আমরা বিনিয়োগ করেছি। এটা সম্ভব হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য। আমি আরও বিনিয়োগ করব। ৫০০০ মেগাওয়াট ব্যাটারি স্টোরেজ ১২০০০ কোটি টাকার প্রকল্প যা দেশের প্রথম হতে চলেছে যেটি এ রাজ্যে আমরা করতে চলেছি। আমরা আবেদন করেছি। পাশাপাশি উন্নত মানের হাসপাতাল করতে চলেছি। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ১৫৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প শুরু করব।’

কীভাবে নতুন শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে তা তুলে ধরতে দেখা যায় অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়াকে। একইসঙ্গে মমতার প্রশংসা শোনা যায় তাঁর মুখেও। হোটেল-হাসপাতাল নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘৭ টি হোটেল তাজ গ্রুপের সঙ্গে চলছে। আরও ১০ টা করতে চলেছি এ রাজ্যে। একটি হাসপাতাল দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন ৩টি। আরও ৩টি হাসপাতাল তৈরি করতে চলেছি দুর্গাপুর, তারাতলা এবং নিউ টাউনে। সার্বিক উন্নয়ন হচ্ছে গোটা রাজ্যে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সেটাই করে চলেছেন।’
বৃহস্পতিবার ধনধান্য অডিটোরিয়ামে আয়োজিত বাণিজ্য সম্মেলনের মঞ্চ থেকেই জিএসটি নিয়ে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। জিএসটি আসায় আখেরে ক্ষতি হয়েছে বলে অতীতেও তিনি বার বার সরব হয়েছেন। শিল্প সম্মেলনে ফের একবার তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘এখন আর রাজ্যের নিজস্ব কর নেই। দেশে শুধুমাত্র একটাই কর আছে— জিএসটি। জিএসটি যখন এসেছিল, প্রথমে সকলে ভেবেছিল রাজ্যগুলোর ভাল হবে। এই অমিত মিত্র বলেছিলেন, অভিন্ন করকাঠামো এলে ভাল হবে! এখন ওঁকে ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন জিএসটির উপরেও টাকা কাটা হচ্ছে। ২০,০০০ কোটি টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে আমার রাজ্য থেকে। এর উত্তর দিতে হবে।’ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে হাতিয়ার করে কেন্দ্র সরকার বাংলায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে একাধিকবার এই অভিযোগ করেছেন মমতা। নিয়োগ দুর্নীতি-সহ নানা মামলায় নেতা-মন্ত্রীদের গ্রেপ্তারির নেপথ্যেও রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে বলেই অভিযোগ করেন মমতা। এবার রাজ্যে শিল্পের বিকাশকে বাধা দিতে কেন্দ্র ব্যবসায়ীদের ‘টার্গেট’ করেছেন বলেই অভিযোগ তাঁর। মমতা এদিন বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। সারাক্ষণ এজেন্সির ভয় দেখালে ব্যবসা করবে কী করে?’
বাংলার নামে অযথা কেউ কেউ অপপ্রচার করছেন বলেও অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘বাংলায় শিল্প সম্ভাবনা নেই বলে অপপ্রচার করছে। রাজ্যের বিরুদ্ধে ভুয়ো খবর ছড়ানো হচ্ছে। বাংলা একদিন সারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে। বাংলা যা পারে, আর কেউ তা করতে পারে না।’
একশ দিনের কাজের নাম বদল প্রসঙ্গে
বৃহস্পতিবার লোকসভায় কেন্দ্রের শাসক দলের আনা বিলের প্রেক্ষিতে ১০০ দিনের প্রকল্পের নাম থেকে মহাত্মা গান্ধীর নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর নামে প্রকল্প মনরেগার নাম বদলে দিচ্ছে। আমরা জানি মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি….কীকরে সম্মান দিতে হয়। আমরা জাতির জনককে ভুলে যাচ্ছি। আমরা কর্মশ্রী প্রকল্প শুরু করেছি। এই প্রকল্পের নাম মহাত্মা গান্ধীর নামে হবে। মনরেগা প্রকল্পে দেশের জনক মহাত্মা গান্ধীর নাম নেই। আমি লজ্জিত। বিল এল দেখা গেল তাঁর নাম নেই। কাজের দিন ৭৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ১০০ দিন করা হবে। এই দেশের নাগরিক হিসেবে এই ঘটনায় লজ্জিত। আমরা দেশের জনককে ভুলে যাচ্ছি। এখানেও খেলা খেলা হচ্ছে। আমাদের একশো দিনের টাকা দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের ভিক্ষা চাই না। আমাদের আত্মসম্মান আছে। আমি জানি না কেন অনেকে ঈর্ষায় আমাদের রাজ্যের নামে কুৎসা করে। কারণ কলকাতা এককালে বাংলা রাজধানী ছিল।’
তাঁর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের নামে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কিছু মানুষ শুধু পশ্চিমবঙ্গের বদনাম করে’। কে বলে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের সম্ভাবনা নেই? পশ্চিমবঙ্গ এশিয়ার অন্যতম বড় লজিস্টিক হাব, যা শিল্পক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ এদিন মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ রাজ্য। কখনও কখনও রাজ্যের বিরুদ্ধে ভুয়ো খবর ছড়ানো হয়। টাকা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় রাজ্যের বদনাম করা হয়। এই ভুয়ো খবরকে চ্যালেঞ্জ করছি। ব্যবসায়ীদের কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। সব ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন নেই।’
এরপরই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ জীবন কামনা করি। কিন্তু অনুরোধ করব এমন কিছু করবেন না যার জন্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। দয়া করে এই বিভেদ করবেন না, সবাইকে নিয়ে চলুন। আমরা শান্তি চাই, শান্তি চাই, শান্তি চাই।’
২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে দুর্গা অঙ্গন নির্মাণ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছিল রাজ্যের মন্ত্রিসভা। আর এদিন ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্য সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দুর্গা অঙ্গনের শিলন্যাসের দিন ঘোষণা করে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানান আগামী ২৯ তারিখ এই অনুষ্ঠান হতে চলেছে। আয়োজন করছে হিডকো। বিকেল ৪টের সময় শিলান্যাস অনুষ্ঠান। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজকে সম্মান জানিয়েই তৈরি করা হচ্ছে প্রাঙ্গন। জগন্নাথ মন্দিরের মতোই বিশাল জায়গা জুড়ে তৈরি হচ্ছে দুর্গা অঙ্গন। শিলান্যাস অনুষ্ঠানে সকলকে আমন্ত্রণও জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।