দুর্নীতির তদন্ত থেকে শিল্পায়নের রোডম্যাপ, দুর্গাপুজোর অনুদান থেকে পার্ক সার্কাস—এক মঞ্চে একের পর এক বিস্ফোরক বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
সকালের রাজনৈতিক শিরোনাম একটাই—আক্রমণের কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর পাল্টা বার্তায় সরব শুভেন্দু অধিকারী। নিউটাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টার থেকে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ আরও চড়িয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে তাঁর দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে। বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে আয়োজিত বাণিজ্য সম্মেলন নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari Politics) দাবি করেছেন, প্রায় ৬৩৫ কোটি টাকার ব্যয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব জনতার সামনে আসা উচিত।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্যের কোষাগার কোনও ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বাণিজ্য সম্মেলনের নামে বিপুল সরকারি অর্থ খরচ হলেও তার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার মাধ্যমে কাজ হয়েছে, তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় আনার ইঙ্গিত দেন তিনি।
তবে শুধু অতীতের সমালোচনা নয়, ভবিষ্যতের শিল্পায়ন নিয়েও বড় বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিউটাউন (New Town Kolkata) থেকে তিনি ঘোষণা করেন, টাটা গোষ্ঠীকে ফের পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে উদ্যোগী হবে সরকার।
সিঙ্গুর (Singur Industry) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের শিল্প প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমির পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। সেই কারণে নতুন করে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদিও টাটাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগের স্থান নিয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।
শুভেন্দুর দাবি, ইতিমধ্যেই একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। সেই সব প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য শিল্পসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের সমন্বয়ে নতুন শিল্পনীতি তৈরির কথাও জানান তিনি।
রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে নন্দীগ্রাম (Nandigram Movement) প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্যও। শিল্পায়ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আনতে গেলে সংঘাত নয়, প্রয়োজন প্রশাসনিক দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। এই মন্তব্যকে অনেকেই অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
এদিন কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারের (Narendra Modi Government) ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে ভূয়সী প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, গত এক দশকে পরিকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা, আবাসন এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে।
মোদি সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের রাস্তা নির্মাণ, রেল পরিষেবা এবং উৎপাদন ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্য পূরণে দেশ এগিয়ে চলেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শুধু শিল্প বা রাজনীতি নয়, দুর্গাপুজোর অনুদান নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন শুভেন্দু। তাঁর মতে, যেসব বড় পুজো কমিটির আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের সরকারি অনুদানের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত। বরং যেসব ছোট বা আর্থিকভাবে দুর্বল পুজো কমিটি সরকারি সহায়তা ছাড়া উৎসব আয়োজন করতে পারবে না, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে পার্ক সার্কাস (Park Circus Kolkata) এবং আসানসোল (Asansol News)-এর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির উল্লেখ করে কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। ধর্ম বা অন্য কোনও অজুহাতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা হলে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি।
এক মঞ্চ থেকে দুর্নীতির অভিযোগ, শিল্পায়নের প্রতিশ্রুতি, কেন্দ্রের প্রশংসা, পুজোর অনুদান নীতি এবং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে কড়া অবস্থান—সব মিলিয়ে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন দেখল বাংলা। এখন নজর একটাই—৬৩৫ কোটি টাকার অভিযোগের তদন্ত কতদূর গড়ায়, আর টাটা-সহ বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগের স্বপ্ন বাস্তবে কত দ্রুত রূপ নেয়।