আবাস যোজনা থেকে রেশন কার্ড, অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ! টাকা ফেরতের আশ্বাসে ক্ষোভ কমল না, চাপে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
দীর্ঘদিনের ক্ষোভ যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হল। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা তোলার অভিযোগে এবার সরাসরি তৃণমূল নেতার বাড়ি ঘেরাও করলেন গ্রামবাসীরা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার [Sonarpur Cut Money Protest] সাঙ্গুর গ্রামে শুক্রবার সকাল থেকে যে উত্তেজনার ছবি দেখা গেল, তা ঘিরে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক চর্চা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার তৃণমূল নেতা [Upendra Mondal] দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা, প্রশাসনিক কাজকর্ম এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধানের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। অভিযোগকারীদের দাবি, টাকা না দিলে কোনও কাজ এগোত না। আর সেই কারণেই বছরের পর বছর বহু পরিবার বাধ্য হয়ে অর্থ দিয়েছেন।
শুক্রবার সকাল থেকেই ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা উপেন্দ্র মণ্ডলের বাড়ির সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। এক সময় বিক্ষোভ তীব্র আকার নেয়। বিক্ষোভকারীদের সাফ দাবি, যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে।
অভিযোগের তালিকাও কম নয়। স্থানীয়দের দাবি, [PM Awas Yojana] সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে নাম তোলার জন্য কিংবা প্রকৃত উপভোক্তাদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে হাজার হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। কারও কাছ থেকে ২ হাজার টাকা, কারও কাছ থেকে ২৪ হাজার টাকা, আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে তাঁদের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।
শুধু সরকারি প্রকল্প নয়, অভিযোগ উঠেছে জমি সংক্রান্ত বিষয়, পারিবারিক বিবাদ কিংবা প্রতিবেশীদের মধ্যে ঝামেলা মেটানোর ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের চাপ তৈরি করা হতো। ফলে ক্ষোভ জমছিল অনেক দিন ধরেই। শুক্রবার সেই ক্ষোভই রাস্তায় নেমে আসে।
বিক্ষোভকারীদের একাংশ আরও অভিযোগ করেন, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ নথি যেমন জব কার্ড ও রেশন কার্ড দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই কারণে অনেকেই সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও দাবি করেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘‘এতদিন আমাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। এবার আর আশ্বাস নয়, টাকা ফেরত চাই।’’
তবে বিক্ষোভের সময় অভিযুক্ত উপেন্দ্র মণ্ডলকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে সামনে আসেন তাঁর স্ত্রী। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি আশ্বাস দেন, যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু সেই আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। গ্রামবাসীদের বড় অংশই জানিয়ে দিয়েছেন, টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ফলে এলাকায় এখনও চাপা উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, উপেন্দ্র মণ্ডলের সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য তথা তৃণমূল নেতা [Prashanta Sardar]–এর কাছেও পৌঁছত।
যদিও সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রশান্ত সর্দার। তাঁর দাবি, তিনি কোনও ধরনের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নন এবং উপেন্দ্র মণ্ডলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই।
ঘটনার জেরে [South 24 Parganas Politics] নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করতে শুরু করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। অন্যদিকে স্থানীয় মানুষ এখন নজর রাখছেন একটাই প্রশ্নে—যে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা আদৌ মিলবে তো?
সাঙ্গুর গ্রামের এই বিক্ষোভ আপাতত একটাই বার্তা দিচ্ছে—ক্ষোভ যখন জমতে জমতে বিস্ফোরিত হয়, তখন তার অভিঘাত রাজনীতির অন্দরে কতটা পৌঁছায়, সেটাই এখন দেখার। আর সবার মনে ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—এবার কি শুধু আশ্বাস, নাকি সত্যিই শুরু হবে ‘কাটমানি’ ফেরতের অধ্যায়?