তিন শতাব্দী, তিন মহাধনকুবের— মিলিয়নিয়ার থেকে ট্রিলিয়নিয়ার, অর্থনীতির ইতিহাসে নতুন রেকর্ড এলন মাস্কের
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে কি সত্যিই শুরু হল এক নতুন যুগ?
যে মানুষটি একসময় অনলাইন পেমেন্ট, বৈদ্যুতিক গাড়ি আর মহাকাশ প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হিসেবে দেখতেন, সেই এলন মাস্ক (Elon Musk) এখন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি ছুঁয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে।
এই খবর সামনে আসতেই প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং বিনিয়োগের দুনিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা। কারণ, ইতিহাসে এর আগে কেউই ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক হতে পারেননি।
অর্থনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে সম্পদের বিবর্তন যেন এক নতুন অধ্যায়ে পৌঁছেছে।
১৭১৯ সালে জন ল (John Law)-কে বিশ্বের প্রথম মিলিয়নিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছিল। সেই সময়ে ইউরোপের আর্থিক ব্যবস্থায় তাঁর উত্থান ছিল এক বিরল ঘটনা।
এরপর প্রায় দুই শতাব্দী পরে, ১৯১৬ সালে জন ডি. রকফেলার (John D. Rockefeller) বিশ্বের প্রথম বিলিয়নিয়ার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। মার্কিন তেল শিল্পে তাঁর আধিপত্য তাঁকে সেই উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
আর ২০২৬ সালে এসে সেই তালিকায় যুক্ত হল নতুন নাম— এলন মাস্ক (Elon Musk)।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, তিনজনের সম্পদের উৎস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জন ল-এর উত্থান এসেছিল আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। রকফেলার গড়েছিলেন তেল সাম্রাজ্য। আর মাস্কের সম্পদের মূল ভিত্তি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি, মহাকাশ গবেষণা এবং ভবিষ্যতমুখী উদ্ভাবন।
মাস্কের যাত্রাপথও কম নাটকীয় নয়।
১৯৯৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি প্রথম মিলিয়নিয়ার হন। তখনও তিনি বিশ্বমঞ্চের পরিচিত মুখ নন। পরে একের পর এক প্রযুক্তি উদ্যোগ তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
২০১২ সালে, ৪১ বছর বয়সে তিনি বিলিয়নিয়ার ক্লাবে প্রবেশ করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেসলা (Tesla), স্পেসএক্স (SpaceX), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে তাঁর আগ্রাসী বিনিয়োগই সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও কম নয়।
বিশ্বজুড়ে অনেক অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তুলছেন— একজন ব্যক্তির হাতে এত বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া কি সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ? সম্পদের এই বৈষম্য ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
অন্যদিকে মাস্ক-সমর্থকদের দাবি, তিনি শুধুমাত্র ব্যবসায়ী নন; বরং প্রযুক্তিগত বিপ্লবের অন্যতম মুখ। বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা, বেসরকারি মহাকাশ গবেষণার বিস্তার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির পেছনে তাঁর অবদান অস্বীকার করা যায় না।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই খবর ঘিরে চলছে তুমুল আলোচনা। কেউ বলছেন এটি আধুনিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য, আবার কেউ দেখছেন বৈশ্বিক সম্পদ বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে।

তবে একটা বিষয় স্পষ্ট— মিলিয়নিয়ার থেকে বিলিয়নিয়ার, আর সেখান থেকে ট্রিলিয়নিয়ার। এই যাত্রা শুধু একজন মানুষের সম্পদের গল্প নয়, বরং গত তিন শতাব্দীতে অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং ব্যবসার বদলে যাওয়া মানচিত্রের প্রতিচ্ছবি।
এখন প্রশ্ন একটাই— এলন মাস্কের পর বিশ্বের দ্বিতীয় ট্রিলিয়নিয়ার কে হবেন, আর সেই দৌড় শুরু হয়ে গেছে কি ইতিমধ্যেই?