সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ঠিক এক বছর আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন করে যে জগন্নাথ ধাম নামকরণ করেছিলেন এবার থেকে সেই ধাম শব্দটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। বাংলার প্রতিবেশী ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝির ব্যক্তিগত অনুরোধের প্রেক্ষিতে আজ এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি নিয়ে আজ নবান্নে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন ওড়িশার বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র। এরপরেই বাংলার মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়ালকে পাশে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “সনাতন সংস্কৃতিকে চরম অপমান করেছিল আগের সরকার। পুরীর শ্রীক্ষেত্র এক এবং অদ্বিতীয়। তার সাথে অন্য কোনো মন্দিরের তুলনা করে তাকে ধাম আখ্যা দেওয়া ধর্মীয় শাস্ত্রের পরিপন্থী। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি আমাদের এই বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠির সম্মান রক্ষার্থেই দীঘার মন্দির থেকে জগন্নাথ দেবের নামের পর জুড়ে থাকা ধাম শব্দটি আমরা আজীবনের জন্য তুলে দিচ্ছি। ধাম শব্দ নিয়ে বিতর্ক আগেও ছিল, সাধারণ ভক্তদের মনেও ক্ষোভ ছিল। তবে দীঘার জগন্নাথ মন্দিরে নিষ্ঠা ভরে প্রভু জগন্নাথ দেবের পূজা-পাঠের যে সনাতনী পরম্পরা রয়েছে, আমাদের শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনেই তা করা হবে। পুজো বা ভক্তিতে কোনো খামতি থাকবে না। আমরা শুধু ধাম শব্দটির বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক অপব্যবহার ওই ক্যাম্পাস থেকে প্রত্যাহার করলাম।
দিঘার জগন্নাথ ধামের নাম বদলে হবে শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। যেখানে ঠাকুরের পুজো হয়, সেই স্থাপত্য শ্রী জগন্নাথ দেব মন্দির নামে পরিচিত হবে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নিয়ম মেনে দিঘায় জগন্নাথ মন্দিরে পুজো হবে। দিঘার পরিচালন সমিতিকে এই বিষয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। ওয়েবসাইটেও সব তথ্য দেওয়া হবে।”

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরে জগন্নাথ মন্দিরের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দীঘা জগন্নাথ মন্দিরের ট্রাস্টি ও প্রধান পুরোহিত তথা ইসকন কলকাতার সহ-সভাপতি রাধারমন দাস।
তিনি বলেন, “আমরা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারীজির এই সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এই বিষয়টি নিয়ে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে এখন থেকে এই মন্দির ‘দীঘা জগন্নাথ মন্দির’ নামে পরিচিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশার মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চেতনাকে প্রতিফলিত করে।
“প্রভু জগন্নাথ সমগ্র বিশ্বের, কিন্তু তাঁর চিরন্তন আবাস পবিত্র ওডিশা ভূমিতে। যদি এই নাম পরিবর্তনের ফলে ওডিশার মানুষের আনন্দ বৃদ্ধি পায় এবং তাঁদের ভাবাবেগের মর্যাদা রক্ষা হয়, তবে আমরা সত্যিই আনন্দিত। সর্বোপরি, আমরা সবাই এক বৃহৎ সনাতনী পরিবার, যাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছেন প্রভু জগন্নাথের প্রতি ভক্তি।”
রাধারমণ দাস জোর দিয়ে বলেন, এই নাম পরিবর্তনকে মতবিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার একটি সুযোগ। “পশ্চিমবঙ্গ ও ওডিশা প্রভু জগন্নাথের মাধ্যমে গভীর সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, যখন ভক্তসমাজ ও সরকার সদিচ্ছা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভক্তিভাব নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে, তখন সমাধান স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।” তিনি আরও বলেন, প্রভু জগন্নাথের প্রতি ভক্তিকেই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার জন্য এবং মতপার্থক্যের পরিবর্তে ঐক্যের বার্তা দেওয়ার জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও ওডিশা সরকার—উভয়ের প্রতিই কৃতজ্ঞ।
“প্রকৃত বিজয় কোনও নামের মধ্যে নয়। প্রকৃত বিজয় হলো, লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রভু জগন্নাথের আরও সান্নিধ্যে আসছেন। তাঁরা বাংলা, ওডিশা কিংবা বিশ্বের যে কোনও প্রান্ত থেকেই আসুন না কেন, জগন্নাথ সকলকে উন্মুক্ত বাহুতে স্বাগত জানান।”
রাধারমণ দাস তাঁর বক্তব্যের শেষে প্রার্থনা করেন, যাতে দীঘা জগন্নাথ মন্দির আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি, প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সনাতন ধর্মের প্রচারের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ক্রমাগত বিকশিত হয়।
“প্রভু জগন্নাথ পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা এবং সমগ্র বিশ্বের মানুষকে আশীর্বাদ করুন। এই পবিত্র মন্দির এমন এক স্থানে পরিণত হোক, যা হৃদয়কে একত্রিত করবে, বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সনাতন ধর্মের চিরন্তন মূল্যবোধ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করবে।”