‘প্রিভিলেজড পুজো এন্ট্রি’ থেকে প্রিভিউ শো—ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ, জমা পড়ল একাধিক নথি
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া কলকাতার দুর্গাপুজোকে ঘিরে এবার নতুন বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এলেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন। তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন-সহ মোট পাঁচ জনের বিরুদ্ধে কলকাতা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ায় শহরের সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ চালানোর চেষ্টা হয়েছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘প্রিভিউ শো’ এবং ‘প্রিভিলেজড পুজো এন্ট্রি’ নামে বিশেষ টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এই কর্মসূচির প্রচারে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা তৈরি হতে পারে যে এর সঙ্গে ইউনেস্কোর প্রত্যক্ষ অনুমোদন বা সহযোগিতা রয়েছে।
সোমবার বিকেলে এই অভিযোগ জমা পড়ে কলকাতা পুলিশের কমিশনার, রাজ্যের ডিজি এবং বৌবাজার থানার কাছে। অভিযোগের তালিকায় ইন্দ্রনীল ও মধুছন্দা সেন ছাড়াও রয়েছেন ধ্রুবজ্যোতি বসু (শুভ), সায়ন্তন মৈত্র এবং রাজন চট্টোপাধ্যায়।
এই অভিযোগ সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া কলকাতার দুর্গাপুজোর নাম ব্যবহার করে আদৌ কোনও বাণিজ্যিক প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছিল কি না।
অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন মেঘদূত ফাউন্ডেশনের কর্ণধার জয়দীপ মুখোপাধ্যায় এবং সগুনা মুখোপাধ্যায়। তাঁদের দাবি, ইউনেস্কোর কাছ থেকে প্রাপ্ত ই-মেল এবং কিছু আইনি নথি তাঁরা পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন। সেই নথিতে নাকি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে এই ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ইউনেস্কোর কোনও অনুমোদনের কথা বলা হয়নি।
শতাব্দীর বাড়িতে বিদ্রোহী সাংসদদের গোপন বৈঠক! আচমকা শুভেন্দুর এন্ট্রিতে তোলপাড় দিল্লির রাজনীতি
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রচারের আড়ালে দুর্গাপুজোকে ঘিরে একটি অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে, যেখানে বিশেষ প্রবেশাধিকার বা নির্দিষ্ট সুবিধার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তাঁদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ঐতিহ্যের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। কারণ অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত মুখ। ফলে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এখনও পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে ইন্দ্রনীল সেন বা মধুছন্দা সেনের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিপরীতে তাঁদের অবস্থান কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, জমা পড়া অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র খতিয়ে দেখার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হবে কি না, কিংবা কোনও প্রাথমিক অনুসন্ধান করা হবে কি না, তা এখন পুলিশের বিবেচনার বিষয়।

এদিকে দুর্গাপুজোর মতো আবেগঘন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত উৎসবকে ঘিরে এই বিতর্ক সামনে আসায় সাংস্কৃতিক মহলেও নানা প্রশ্ন উঠছে। ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার কতটা বৈধ ছিল? আদৌ কোনও অনুমোদন ছিল কি? নাকি শুধুই প্রচারের কৌশল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন খুঁজছে অনেকেই।
নথি, অভিযোগ এবং পাল্টা ব্যাখ্যার অপেক্ষায় আপাতত নজর প্রশাসনের দিকে। তবে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই অভিযোগ কি শুধুই বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তদন্তের পথে গিয়ে আরও বড় কোনও তথ্য সামনে আসবে?