সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“সিরিয়াল যারা করেন, তাঁদের বলব। আজকাল সিরিয়ালগুলিতে দেখি, এ ওকে বিষ দিচ্ছে, ও ওকে বিষ দিচ্ছে। একটি পরিবারে তিনজন ঝগড়া করছে। একটি বাস্তব চরিত্র তো দুটি ঝগড়াটে চরিত্র। আর এর মাধ্যমে আজেবাজে জিনিস শেখানো হচ্ছে। এর ফলে সমাজে শিশুরা ভুল শিখছে, অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।” বাংলা সিরিয়ালের বিষয়বস্তু সমাজে খারাপ প্রভাব ফেলছে বলে এভাবে বৃহস্পতিবার উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবসে মহানায়ক সম্মানে মঞ্চ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমি সমস্ত টিভি সিরিয়ালের মালিকদের বলব, এটা তাঁদের হাতে আছে। দয়া করে খারাপ কিছু শেখাতে যাবেন না। আর সিরিয়াল দীর্ঘায়িত করতে গিয়ে প্রতিদিন গুন্ডামি। ভালো জিনিস দিয়ে বাড়ান, কত উদ্ভাবনী ভালো বিষয় আছে। তা না করে কী করবে, ও ওকে গুলি করছে, ও ওকে বন্দুক ধরছে। আমি যখনই দেখি বন্ধ করে দিই। অন্যরা কী করে জানি না। সারাদিন আমরা কাজে ব্যস্ত থাকি। আমরা কি টেনশন করব? ওটা টেনশনের জিনিস না, রিল্যাক্সেশনের জিনিস। হাসি-খুশি মজার সামাজিক গল্প তৈরি করুন। যে গল্প আমাদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসে। যে গল্প মানুষের বিবেক জাগ্রত করে।”
এছাড়াও, বাংলা গানের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “সব সিরিয়ালে আমি দেখি বাংলা গান কোথায়? এরা ভাবে কিছু ঝিকঝ্যাক ধুমধাম দিয়ে দিলেই হয়ে গেল। আরে বাজান না, সমস্যা নেই। কিন্তু টলিউডে বাংলা গানটা তো একটু বেশি করে দেবেন। এটা সবাইকেই ভাবতে হবে।”
মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবসে উত্তম কুমার স্মরণে ধনধান্য অডিটোরিয়ামে আয়োজিত হয়েছিল মহানায়ক সম্মান ২০২৫ পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠানে। আর এই অনুষ্ঠানের মঞ্চেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে এল বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ। এদিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বারংবার স্বর্ণযুগের কালজীয় বাংলা গানের প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। উত্তর কুমার প্রসঙ্গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন বলেন, ‘আমাদের সকলের প্রাণের মানুষ। আমি এখনও মনে করি তিনি দেশের গর্ব, জাতির গর্ব, সংস্কৃতির গর্ব, চলচ্চিত্রের গর্ব। মহানায়ক উত্তম কুমার। আমার জীবনে খুব আফশোষ আছে। উত্তম কুমারের সঙ্গে কোনও দিন দেখা হয়নি। এই না দেখাটা, অদেখাটা আমায় বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।’ বাংলা সিনেমা এবং তার গান প্রসঙ্গেও এদিন মুখ্যমন্ত্রী নিজের ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন ভবানীপুরে অনেক সিনেমা হল ছিল। পূর্ণ, ইন্দিরা, ভারতী, বসুশ্রী। যখন ক্লাস ৪-৫ এ পড়ি, মায়ের সঙ্গে হাত ধরে ৯টা-১২টার সিনেমা দেখতে যেতাম। মা যেত, আমায় সঙ্গে নিত। তখন পুরিয়া চানাচুরের প্যাকেট পাওয়া যেত। চানাচুর খেয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম। মা সিনেমা দেখত। কিন্তু যে গানগুলো শুনতাম, এত অপূর্ব, মাধুর্যপূর্ণ, সেগুলো আজও আমাদের ঠোটস্থ। আজকাল আমি দেখি বাংলা গানের চল সিরিয়াল থেকে শুরু করে সিনেমায় একটু কম। কম ব্যবহার করি আমরা। আমি আবারও বলছি সব ভাষাই ভাল। সব ভাষার গানই ভাল। তবে বাংলার স্বর্ণযুগের যে গানগুলো রয়েছে তার বাজার কিন্তু কোনওদিনও ফুরোবে না। বাংলা গানের একটা মাধুর্য, কথা, সংস্কৃতি, সুর, ভাষা- একবার ভাবুন তো, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা, আশা, নির্মলা মিশ্র, সলিল চৌধুরী, আরতি, বনশ্রী এঁরা কত ভাল গান গাইতেন। আমরা ছোটবেলায় অনুরোধের আসর শুনতাম। মুখস্থ করার একটা প্রবণতা ছিল। ২টো আড়াইটেয় অনুষ্ঠান শুরু হলে, সেই সময় পাক্কা রেডিওর সামনে বসতে হত। এখন সেসব কোথায়।’

কারা কারা কোন ক্ষেত্রে সম্মানিত
মহানায়ক শ্রেষ্ঠ সম্মান পেয়েছেন পরিচালক এবং অভিনেতা গৌতম ঘোষ। একাধিক অসামান্য ছবি ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। গৌতম ঘোষের পদ্মা নদীর মাঝি, মনের মানুষ, পার, অন্তর্জলী যাত্রা এবং আরও অসংখ্য ছবি আজীবন দর্শকদের মনে জায়গা করে রাখবে। বর্ষীয়ান এই পরিচালক, অভিনেতা এবং থিয়েটার আর্টিস্ট এবার পেয়েছেন মহানায়ক শ্রেষ্ঠ সম্মান ২০২৫ পুরস্কার।
সিনেমার ক্ষেত্রে মেকআপ আর্টিস্ট একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। এই ক্ষেত্রে মহানায়ক সম্মান ২০২৫ পুরস্কার পেয়েছেন মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুণ্ডু। বহু বাংলা সিনেমায় দক্ষ ভাবে প্রস্থেটিক মেকআপ করেছেন তিনি। অপরাজিত ছবির জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। প্রোডাকশন ডিজাইনার আনন্দ আঢ্যও পেয়েছেন মহানায়ক সম্মান। ইনিও অপরাজিত ছবির জন্য পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। গার্গী রায়চৌধুরী টেলিভিশন এবং টলিউডের পরিচিত মুখ। একাধিক ধারাবাহিকে কাজ করেছেন গার্গী। বহু বাংলা ছবিতেও দেখা গিয়েছে অভিনেত্রীকে। মহানায়ক সম্মান ২০২৫ পুরস্কার পেয়েছেন গার্গী রায়চৌধুরীও। মহানায়ক সম্মান ২০২৫ পুরস্কার পেয়েছেন গায়িকা ইমন চক্রবর্তী। প্রাক্তন ছবির তুমি যাকে ভালবাস গানের নেপথ্য কণ্ঠ শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন ইমন। বিখ্যাত গায়ক ও সঙ্গীত নির্দেশক রূপঙ্কর বাগচি এবার পেলেন মহানায়ক সম্মান ২০২৫ পুরস্কার।