শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
ভোটের আগে বিভিন্ন রাজ্যে নগদ টাকা বা বিনামূল্যে পরিষেবা দেওয়ার ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এবার সেই বিতর্কে সরাসরি মন্তব্য করল দেশের শীর্ষ আদালত। Supreme Court of India স্পষ্ট প্রশ্ন তুলেছে—ভোটের মুখে হঠাৎ করে নগদ টাকার স্কিম ঘোষণা করা হলে “মানুষ কি আর কাজ করতে চাইবে?”
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি Surya Kant-এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সামনে আসে। বেঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলি। তামিলনাড়ুর একটি মামলার শুনানির সময় এই মন্তব্য করা হয়। মামলাটি দায়ের করেছিল Tamil Nadu Power Distribution Company Limited, যারা ইলেকট্রিসিটি অ্যামেন্ডমেন্ট রুল চ্যালেঞ্জ করেছিল।
“দান-খয়রাতি সংস্কৃতি” নিয়ে প্রশ্ন
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি রাজ্যে ভোটের আগে হঠাৎ করে উন্নয়নমূলক বা নগদ সহায়তার স্কিম ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন—এই প্রবণতা কি একটি নতুন “দান-খয়রাতি সংস্কৃতি” তৈরি করছে?
আদালত আরও জানায়, সামাজিক সুরক্ষার নামে যদি নির্বিচারে নগদ টাকা বিলি করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ ভর্তুকি বা ফ্রি পরিষেবায় খরচ হয়ে গেলে পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—এসব খাতে ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
প্রধান বিচারপতি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন—কে বিল দিতে সক্ষম আর কে নয়, তার সঠিক মূল্যায়ন কীভাবে হবে? পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ছাড়া বড়সড় ভর্তুকি চালু করা হলে তার দায় কে নেবে?
তামিলনাড়ুর বিনামূল্যে বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রসঙ্গ
তামিলনাড়ুতে সর্বস্তরের গ্রাহকদের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব ঘিরেই এই মামলার সূত্রপাত। আদালত জানায়, এই ধরনের নীতির ক্ষেত্রে রাজ্যগুলিকে বাজেটে স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে—অর্থের জোগান কোথা থেকে আসছে।
বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত নিলে বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলিকে হঠাৎ করেই নতুন করে শুল্ক কাঠামো ও বাজেটের হিসেব সাজাতে হয়। এতে আর্থিক চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ব্যাহত হয়।
বাংলায় জল্পনা
যদিও শুনানিতে পশ্চিমবঙ্গের নাম সরাসরি উচ্চারিত হয়নি, তবুও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, সম্প্রতি রাজ্যে একাধিক নগদ সহায়তা প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে Lakshmi Bhandar প্রকল্পের অর্থবৃদ্ধি এবং সদ্য ঘোষিত Yuba Saathi প্রকল্প, যেখানে বেকারদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সমালোচকদের দাবি, ভোটের আগে এই ধরনের স্কিম রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার কৌশল। তবে রাজ্যের শাসকদলের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, এগুলি সামাজিক সুরক্ষার অংশ। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের হাতে নগদ পৌঁছে দিলে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয় এবং গ্রামীণ বাজারে গতি আসে।
আদালতের মূল বার্তা
শীর্ষ আদালত কিন্তু একটি স্পষ্ট রেখা টানতে চেয়েছে—অসামর্থ্যদের পাশে দাঁড়ানো আর ভোটের মুখে নির্বিচার খয়রাতি এক নয়।
আদালত বলেছে, বহু রাজ্য ইতিমধ্যেই আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে ভুগছে। এই অবস্থায় যদি পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া বড় অঙ্কের ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই বোঝা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এই বিপুল অর্থ হাসপাতাল, স্কুল, সড়ক বা অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা যেত। সব টাকা যদি বিনামূল্যে পরিষেবা দিতে গিয়ে খরচ হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন থমকে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আদালতের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের মতে, ভারতে সম্পদের অভাব নেই, কিন্তু বণ্টনের কাঠামো ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারই বড় প্রশ্ন।
কেউ কেউ বলছেন, নগদ সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। কাজের বিনিময়ে আয়—এই ধারণাই টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি।
সামনে কী?
এই পর্যবেক্ষণ কোনও চূড়ান্ত রায় নয়, তবে বার্তাটি স্পষ্ট—রাজ্যগুলিকে আর্থিক দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নীতি গ্রহণ করতে হবে। বাজেটে প্রকল্পের উৎস ও খরচের হিসেব পরিষ্কার না থাকলে আদালত ভবিষ্যতে আরও কড়া অবস্থান নিতে পারে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।

ভোটের আগে নগদ টাকার স্কিম কি রাজনৈতিক কৌশল, নাকি প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষা—এই বিতর্ক নতুন নয়। তবে এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মন্তব্যে সেই বিতর্ক আরও জোরালো হল।
আগামী দিনে বিভিন্ন রাজ্য কীভাবে তাদের কল্যাণমূলক প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো ব্যাখ্যা করে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে অর্থনীতিবিদ—সবার। একথা স্পষ্ট, “ফ্রি” শব্দটি যতই জনপ্রিয় হোক, তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কতটা—সেই হিসেব এখন আদালতের কড়া নজরে।