সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“পুলিশের অনুমতি ছাড়া নবান্ন অভিযান হলে আপত্তি কোথায় থাকে?” ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে তৃণমূলের বাৎসরিক শহীদ দিবসের সমাবেশ নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের সিপিএমের দায়ের করা মামলা এবং তার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে এমন কটাক্ষ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মতলায় একুশের শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে কড়া নজরদারি নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। বেঁধে দেওয়া হয়েছে মিছিল না করার নির্দিষ্ট সময় সীমা। এই পরিস্থিতিতে রবিবার সভামঞ্চের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখতে এসে তৃণমূল সুপ্রিমোর মন্তব্য, “আমাদের আন্দোলন কমানোর ক্ষমতা ছিল না সিপিএমের গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ করতে গিয়ে ওরা এমনভাবে গুলি চালিয়েছিল যে ১৩ জন ঘটনাস্থলে মারা যান দেড়শো জন পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন প্রায় ৩৩ বছর ধরে এই প্রোগ্রাম এখানে হয় তার কারণ এখানে অনেকগুলো প্রাণ লুটিয়ে পড়েছিল। এই এলাকায় রক্তের বন্যা বয়েছিল। তাই আমাদের বছরে একটাই প্রোগ্রাম শহীদ স্মরণে আমরা এখানেই করি। এ নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে। আমার বক্তব্য তারা যখন নবান্ন অভিযান করেন পুলিশ অনুমতি ছাড়া তখন আপত্তি কোথায় থাকে? আমাদের দেখে ওদের প্যারালাল প্রোগ্রাম করতে হয়। কোথায় আমরা তো ওদের দেখে প্যারালাল প্রোগ্রাম করি না। তৃণমূলের থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।”
১৯৯৩ সালের সেই রক্তাক্ত ২১ জুলাইয়ের ঘটনার স্মৃতি উসকে দিয়ে মমতা বলেন, “সেই সময় সিপিএম কাউকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিত না। আমরা চাইছিলাম সচিত্র পরিচয়পত্র। আমাদের আন্দোলন দমানোর ক্ষমতা ছিল না সিপিএমের। গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে শহিদ করেছিল ওরা। ৩৩ বছর ধরে এই কর্মসূচি এখানে হয়, কারণ এখানেই রক্ত ঝরেছিল। একটাই প্রোগ্রাম, শহিদদের স্মরণে, সেটাই আমরা ধর্মতলায় করি।”
দলনেত্রী আরও বলেন, “প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ইতিমধ্যেই কলকাতায় এসে পৌঁছেছেন। অতিবৃষ্টি ও প্লাবনের পরেও প্রাণের টানে, শহিদ স্মরণে, তর্পণের জন্য আসেন। অনুষ্ঠান করলে তৃণমূলের থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। কথায় কথায় খালি চোর, ডাকাত বলে– এদের মুখের কোনও ভাষা নেই। খালি মানুষের উপর অত্যাচার, বাংলাভাষীদের উপর অত্যাচার। আমি সব রাজ্যের মানুষকে সম্মান করি। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাঁকে জেলে পুরে দিতে হবে। এসব নিয়ে যা বলার কাল বলব। ২১ জুলাই কোনও দিন বন্ধ হবে না। প্রত্যেক বছর চলবে।”
রাত পোহালেই তৃণমূলের শহিদ সমাবেশ। শহরজুড়ে সাজ-সাজ রব। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটাই শেষ ২১ জুলাই হওয়ায় সমাবেশ ঘিরে থাকছে বাড়তি গুরুত্ব। ফলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অন্যান্য বারের তুলনায় একটু বেশি। সভাতে যোগ দিতে শুক্রবার থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকেরা দলে দলে কলকাতায় আসতে শুরু করেছেন। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগণা, সব জেলা থেকেই আসতে শুরু করেছেন দলীয় সমর্থকেরা। তার মধ্যেই প্রত্যেকবারের মতো রবিবার বিকেলে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ধর্মতলায় মানুষের মঞ্চ পরিদর্শনে যান মমতা। রবিবার সন্ধ্যায় সভার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে ধর্মতলা চত্বরে এলেন তৃণমূল সুপ্রিমো এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভামঞ্চ এবং আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন তিনি। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলার পর, তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, যেখানে বাম এবং বিজেপি উভয়কেই একযোগে আক্রমণ শানান। একই সাথে, কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে যানজট এড়াতে দল যে প্রস্তুত, সেই বার্তাও দেন। এদিকে, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম পরিদর্শন করেছেন।
এদিন ধর্মতলায় মঞ্চ পরিদর্শনের পর বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূল সমর্থকদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ঝড়-জল হলেও আসবেন। শান্তিপূর্ণভাবে আসুন। একুশে জুলাইয়ের অনুষ্ঠান চিরকাল চলবে। সাধারণ মানুষের হয়তো একটু অসুবিধা হবে কালকে। ইতিমধ্যে লক্ষাধিক মানুষ চলে এসেছেন। আগামিকালও জেলাগুলি থেকে মানুষ আসবেন।”
গীতাঞ্জলি স্টেডিয়ামে বিশাল বন্দোবস্ত
সোমবার ধর্মতলার সমাবেশে অংশ নিতে লাখো মানুষের ঢল নামবে শহরে। দক্ষিণ কলকাতার গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম এখন রীতিমতো রাজনৈতিক কর্মীদের অস্থায়ী আবাস। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কর্মী-সমর্থকের জন্য থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে তৃণমূলের তরফে। গোটা বিষয়টি সরাসরি তদারকি করছেন কলকাতা পুরসভার বোরো চেয়ারম্যান সুশান্ত ঘোষ।
তিনি জানিয়েছেন, “প্রতি বছরই আমরা এই আয়োজন করি। এবারও কোনও খামতি রাখিনি। কর্মীদের থাকার, খাওয়ার, এমনকি চিকিৎসার জন্যও সবরকম ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”
মালদা-মুর্শিদাবাদ থেকে আসা কর্মীদের দখলে শিবির
এই শিবিরে ইতিমধ্যেই প্রায় দু’হাজার মানুষ এসে পৌঁছেছেন। শিবির চত্বরে সাজানো হয়েছে তৃণমূলের পতাকা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে। অসুস্থ হলে যাতে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যায়, তার জন্য রয়েছে মেডিকেল টিম ও ওষুধের বন্দোবস্ত। এছাড়াও বিশাল হ্যাঙ্গারের ব্যবস্থা করা হয়েছে মাঠ জুড়ে। জানা গিয়েছে, স্টেডিয়ামের দু’টি গেট দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা স্টেডিয়ামে ঢুকতে পারবেন। দু’টি মেডিক্যাল ক্যাম্প-সহ অ্যাম্বুল্যান্স থাকবে।
শিশুদের জন্য আলাদা দুধের ব্যবস্থা ও মহিলাদের জন্য আলাদা থাকার বন্দোবস্তও রাখা হয়েছে। খাদ্য তালিকায় আছে ডিম, ডাল ও আলু-সোয়াবিনের তরকারি, যা সকলের উপযোগী ও সহজ পাচ্য। মূলত মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার কর্মীরাই এই শিবিরে রয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে তাঁরা গর্বিত, আর এই ব্যবস্থায় তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
একুশে জুলাই শহিদ দিবস বরাবর রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের মেগা ইভেন্ট। এবার আবার ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শেষ একুশ জুলাই। ফলে তার গুরুত্ব অনেকটাই বেশি। তার তোড়জোড়ও তুঙ্গে। রাত পোহালে, সোমবারই সেই শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিন। মঞ্চ প্রায় প্রস্তুত। ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে তৈরি মঞ্চে বসতে পারবেন একসঙ্গে প্রায় ৬০০ জন। রবিবার বিকেল থেকেই সভামঞ্চ চত্বরে রয়েছেন তাবড় তাবড় নেতারা। খতিয়ে দেখে নিচ্ছেন সবটা। এদিনই ঘড়ির কাঁটায় ৬ টা বেজে ৫ মিনিট নাগাদ ধর্মতলায় পৌঁছন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোজা পৌঁছে যান ভিক্টোরিয়া হাউসের উলটোদিকের মূল মঞ্চে। সেখান থেকেই দলের নেতা ও পুলিশ আধিকারিকদের কাছ থেকে গোটা পরিস্থিতির তথ্য নেন।

উল্লেখ্য, এবার একুশে জুলাই সমাবেশের মূল মঞ্চটি ত্রিস্তরীয় এবং আড়ে-বহরে অনেকটা বড়। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে তিন ধাপে তৈরি মঞ্চে বসবেন শীর্ষ নেতৃত্ব, অতিথি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, শহিদ পরিবারের সদস্যরা। প্রথম মঞ্চটি মাটি থেকে ১১ ফুট উঁচু, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টির উচ্চতা যথাক্রমে ১২ ও ১৩ ফুট। মঞ্চের দৈর্ঘ্য ৮০ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট। গোটা মঞ্চ ঘিরে ফেলা হবে দলীয় পতাকা তেরঙ্গার রঙে। আরও জানা যাচ্ছে, তিনটি মঞ্চের প্রথমটিতে থাকবেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের প্রথম সারির শীর্ষ নেতারা। দ্বিতীয় মঞ্চে থাকবেন শহিদ পরিবারের সদস্যরা। আর মঞ্চের তৃতীয়ভাগে থাকবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা।