সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কাজ বন্ধ হোক। মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাহীন ভাবে আধিকারিক ও মানুষের উপর চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা খুবই বিপজ্জনক। বিএলও-দের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এত কম সময়ের মধ্যে বিএলও-দের উপর অবাস্তব কাজের চাপ। সাধ্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হোক এসআইআর-এর জন্য। অবলম্বন করা হোক সঠিক পদ্ধতি।’ এমন বিস্ফোরক অভিযোগ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে চিঠি পাঠালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিহারের পর ভোটমুখী বাংলাতেও জোরকদমে এসআইআর-এর কাজ চলছে। কিন্তু বিএলও-দের মৃত্যুর খবরও উঠে আসছে লাগাতার। অভিযোগ, অসম্ভব চাপ সহ্য করতে না পেরে কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, কেউ আবার বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার রাস্তা। পশ্চিমবঙ্গ বলেই নয়, রাজস্থান থেকেও এমন ঘটনা সামনে এসেছে। সেই আবহেই জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেন মমতা।
একে অল্প সময়, তার উপর চাপ, হুমকি-হুঁশিয়ারি। সেই নিয়ে বিএলও-রাও বার বার সরব হন। আবার বাবা-ঠাকুরদার আমলের নথি খুঁজে বের করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেও। এবার মমতা এসআইআর স্থগিত রাখতে আবেদন জানালেন। একদিন আগেই জলপাইগুড়ি থেকে এক বিএলও-র আত্মঘাতী হওয়ার খবর সামনে আসে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও অনেকের প্রাণহানির খবর সামনে এসেছে। চিঠিতে তারও উল্লেখ করেছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, ‘গতকাল এসআইআর-এর চাপে জলপাইগুড়ির মাল-এ বিএলও আত্মঘাতী হয়েছেন। এসআইআর-এর শুরুতে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিকল্পনাহীন, হঠকারী সিদ্ধান্তের শিকার মানুষ এবং নির্বাচনের কাজে যুক্ত আধিকারিকরা।’ যথাযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জিও জানিয়েছেন মমতা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ধান চাষের ব্যস্ততম সময়ে এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো অযৌক্তিক। এই প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। অতীতেও এই প্রক্রিয়াকে ‘অবাস্তব পরিকল্পনা’ এবং ‘সুপার এমার্জেন্সি’ বলে অভিহিত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদানের বিষয় বিবেচনা করতে অনুরোধ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এসআইআর প্রক্রিয়ার সময়সীমা পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর সতর্কবার্তা, এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে সংশোধন না করা হলে তা সকলের কাছেই ক্ষতির কারণ হবে।
তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিতে লেখেন,’ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) যে ভাবে জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমি বারবার আমার গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। এখন এসআইআর ঘিরে পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে আমি আপনাকে লিখতে বাধ্য হচ্ছি। আধিকারিক ও নাগরিকদের উপর যেভাবে এই প্রক্রিয়া জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা কেবল অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খলই নয়, বিপজ্জনকও বটে। এমনকী প্রাথমিক প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা বা যোগাযোগের অনুপস্থিতি প্রথম দিন থেকেই প্রক্রিয়াটিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
পাশাপাশি তাঁর আরও দাবি, বিএলও-দের প্রশিক্ষণে গুরুতর ফাঁক রয়েছে। তাঁরা কাজের মাঝখানে ভোটারদের সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না। এই কারণেই প্রক্রিয়াটি বেজায় জটিল হয়ে উঠেছে।
শুধু তাই নয়, তিনি বিএলও -দের কঠোর প্রচেষ্টার জন্য গভীর প্রশংসা করেন। সেই সঙ্গে তিনি বিএলওদের উপর অবাস্তব কাজের চাপ, অসম্ভব টাইমলাইন এবং ডেটা এন্ট্রির দায়িত্ব নিয়েও অভিযোগ করে বলেন, ‘এই গতিতে কাজ হলে এটা নিশ্চিত যে ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে একাধিক নির্বাচনী এলাকার ভোটার ডেটা আপলোড করা যাবে না। অনেক জায়গায় চাপে পড়ে বিএলওরা ভুল তথ্য জমা দিচ্ছে। যার ফলে বাড়ছে সমস্যা। ভোটার তালিকা নির্ভুল থাকছে না।’

মুখ্যমন্ত্রীর এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল জানিয়ে দিলেন, এসআইআর এর কাজ ভালভাবে চলছে। তিনি বলেন, ‘এসআইআর স্থগিত করা হবে কিনা, এটা ইসিআই দেখবে, সিও তো স্রেফ নির্দেশ পালন করে মাত্র। তবে এটুকু বলছি, কাজ খুব ভাল ভাবে হচ্ছে।’ যা প্রকারান্তরে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগকেই খণ্ডন করার শামিল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ছড়িয়েছে।