কলকাতা ও বিধাননগর পুরবোর্ডকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য অগ্নিমিত্রার, তদন্তের হুঁশিয়ারি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পরেই এক মাস পূর্ণ হতে না হতে বিধান নগর মিউনিসিপ্যালিটির মেয়র পদে ইস্তফা দিয়েছেন কৃষ্ণা চক্রবর্তী। তারপরে ২৪ ঘন্টা কাটতে না কাটতেই কলকাতার মেয়র পদে ইস্তফা দিয়েছেন ফিরহাদ হাকিম। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ভোট প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আগে থেকেই মেয়রহীন দুর্গাপুর এবং হাওড়া পুরসভা। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই এই দুই পুরসভায় প্রশাসক বোর্ড বদল করে ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে শাসক দল হোক অথবা প্রশাসক বসানো, বর্ষা যখন বাংলার একেবারে দোরগোড়ায় অপেক্ষা করছে সেই সময় সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এইভাবে একের পর এক পৌরসভা এবং প্রশাসকহীন হয়ে যাওয়ায়। কারণ চিরাচরিত নিয়ম মেনে বর্ষার ঠিক আগে থেকেই রাস্তাঘাট সারানোর পাশাপাশি জল নিকাশির ব্যবস্থা ঠিক করার জন্য কাজ করে থাকে সংশ্লিষ্ট পৌরসভা গুলি। তবে এবারে ভোট প্রক্রিয়া চলার জন্য সেই কাজ আটকে ছিল দীর্ঘদিন। আর ভোট মেটার পরেই যেভাবে একের পর এক মেয়র নিজেদের দায় এড়িয়ে পদত্যাগ করে পালাতে শুরু করেছেন তাতে এবারের বর্ষায় ঘরবাড়ি ভাষার আশঙ্কায় দিন গুনছেন কলকাতা এবং বিধাননগরের পাশাপাশি হাওড়া, দুর্গাপুরের মানুষ।
তবে এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে যেন ভোগান্তির মধ্যে পড়তে না হয় তা দেখার জন্য ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে এলাকায় বাড়তি টাইম দিতে শুরু করেছেন বিজেপি বিধায়করা। সোনারপুর দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক রূপা গাঙ্গুলী ইতিমধ্যেই রাজপুর সোনারপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং বর্তমান তৃণমূল কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়ে দিয়েছেন ভোট হওয়ার আগে পর্যন্ত তারা যেন পদত্যাগ করার কথা না ভেবে সাধারণ মানুষ তাদেরকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা পালন করার জন্য বিজেপি সরকারের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করেন।
অন্যদিকে বাংলায় বর্ষা ঢোকার ঠিক আগে যেখানে অধিকাংশ নিকাশী নালা এবং রাস্তাঘাটের কাজ বর্ষার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়নি, এই পরিস্থিতিতে মেয়রহীন পুরসভা এলাকাগুলিতে সাধারণ মানুষকে তার ফল ভোগ করতে হবে কিনা তা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে তখন পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেন রাজ্যের পুর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘আমার মনে হয় খুব ভাল করে পরিকল্পনা করে এটা করা হয়েছে। ফিরহাদ হাকিম, বিধাননগর পুরসভার মেয়র, হাওড়া… সব জায়গাতেই বোধহয় ওনাদের সুপ্রিমোর কথাতেই এটা করা হচ্ছে যে নতুন সরকার এসেছে, একসঙ্গে এসব করে একটু সমস্যায় ফেলা যাক। আমার মনে হচ্ছে একটা ষড়যন্ত্র চলছে। ১৫ বছরে ফিরহাদ হাকিম মহাশয় কী কী কাজ করেছেন, সেটা তো মানুষ দেখতেই পাচ্ছে। রাস্তাঘাটে চলার অবস্থা নেই। পার্ক, জলাশয় একদম নোংরা। কোনওদিন কোনও উন্নয়নের কাজ হয়নি। জলাশয় বুজিয়ে বাড়ি তৈরি হয়ে গিয়েছে। ১০ দিন মতো বাকি বর্ষাকালের। সেখানে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেলেন ফিরহাদবাবু? তবে বাংলার মানুষকে বলব চিন্তা করবেন না। যোগ্য অফিসার আছেন, যোগ্য কর্মীরা আছেন, আমরা একসঙ্গে মিলে খুব ভাল কাজ করব।’
কলকাতার মেয়র অথবা বিধাননগরের মেয়রের পদত্যাগেও যে বাংলার মানুষের উন্নয়নে কোন বাধা পড়বে না। তার স্পষ্ট করে দিয়ে সংশ্লিষ্ট পুরো এলাকাগুলির মানুষের উদ্দেশ্যে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘ভাবছেন বর্ষার ১০ দিন আগে আমাদের খুব বিপদে ফেলে পালিয়ে যাবে? পারবেন না বিশ্বাস করুন। বাংলার মানুষ যে জনাদেশ দিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে আমাদের নিয়ে এসেছে, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা এই কঠিন সময় ভালভাবে পার করে যাব। আমরা সবাই মাঠে রয়েছি।’
কলকাতা পুরসভা প্রসঙ্গে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা বলেন, ‘বহু পুরসভা, কর্পোরেশন নিয়ে তদন্ত হবে। মৌখিকভাবে অভিযোগ এসেছে। নিয়ম মতো ৭২ ঘণ্টা সময় দিতে হয়। কিভাবে এতটা সেল্ফিশ তৃণমূলীরা। বর্ষা আসছে। তার আগে কলকাতার মেয়র পদত্যাগ করলেন। তবে যাতে সমস্যা না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া হবে। ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করব, উত্তর না এলে প্রশাসক বসবে কলকাতা পুরসভায়। একইভাবে বিধাননগর পুরসভাতেও।’ মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর থেকেই পরিচ্ছন্নতায় জোর দিয়েছেন অগ্নিমিত্রা। ছবি তুলে পাঠালেন সাফ হবে নোংরা, তার জন্য ইতিমধ্যেই স্বচ্ছ অ্যাপ তৈরি করেছে সরকার। আম্রুত প্রকল্প এবং ডাম্পিং গ্রাউণ্ডের সমস্যা রয়েছে, উত্তরবঙ্গ থেকে জানালেন অগ্নিমিত্রা। মন্ত্রী বলেন, ‘বস্তি এলাকায় কমিউনিটি টয়লেট করা হবে। জমি চাই। বাজার, বাসস্ট্যাণ্ডে পাবলিক টয়লেট। ট্যুরিস্ট এলাকায় উন্নতমানের টয়লেট তৈরী করা হবে। প্রতি এলাকায় ২ বার করে ঝাড়ু দেওয়া হবে ব্যস্ত এলাকায়। মন্দির এলাকায় কারখানা বানাবো। মহিলাদের নিয়োগ করা হবে। উত্তরের তুফানগঞ্জে স্বচ্ছ অ্যাপ তৈরী করেছি। আবেদন করলেই ২ ঘন্টার মধ্যে সাফ।
বাড়ি থেকেই জৈব, অজৈব ময়লা পৃথকীকরণ করতে হবে। বাড়ির লোকেরা বা করলে পরিষ্কার করা হবে না। প্রতিটি বাড়িতে কিউ আর কোড বসানো হবে।’

গত বছর বন্যা, ধসে উত্তরবঙ্গের বহু এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, সেই সমস্যা যাতে এই বছর না হয়, তার জন্য সচেষ্ট সরকার, জানালেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আগামী বর্ষায় যাতে কোনও এলাকায় যেন জল না জমে, তা দেখতে হবে। নর্দমা পরিষ্কার করতে হবে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে জরিমানা। রাস্তায় ময়লা ফেললে বা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ ব্যবহার করলে জরিমানা। পানের পিক ফেললে জরিমানা। রাস্তায় বেআইনি পার্কিং করলে জরিমানা। রসিদ নই, মেশিন ব্যবহার করা হবে। বেআইনি হোর্ডিং খোলা হবে। ডিজিটাল হোর্ডিং খোলা হবে। কর আদায়ে বাসস্ট্যাণ্ডে ডিজিটাল হোর্ডিং।’