যাদবপুর স্টেশন চত্বরে বুলডোজার অভিযান, দোকান উচ্ছেদ ঘিরে বিক্ষোভে আহত সুজন, আটক সৃজন
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
পূর্ব ঘোষণা মতোই যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন রেলের জমিতে থাকা দোকান বাজার গুঁড়িয়ে দিয়ে রাতারাতি এলাকার সাফ করে ফেলল বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকারের বুলডোজার। আর নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে না পারা তৃণমূল আন্দোলনে নামতে সংকোচবোধ করলেও বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সুজন চক্রবর্তী। পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সম্পাদক সৃজন।
যাদবপুর স্টেশনে (Jadavpur Station) হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র যাদবপুর। রবিবার সন্ধে থেকেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়। বুলডোজ়ার (Bulldozer) দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়, একের পর এক বেআইনি দোকান। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছন সিপিএম (CPIM) ও কংগ্রেস নেতারা (Congress)। উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবাদ করেন সুজন (Sujan Chakraborty), সৃজনরা (Srijan Bhattacharya)। ঘটনা প্রসঙ্গে সুজন চক্রবর্তী বলেন, “পুলিশ অসভ্যের মতো, অমানুষের মতো, ডবল ইঞ্জিন সরকারের অর্ডার নিয়ে পিটিয়েছে। প্রথমে বাচ্চাদের উপরে, আমি বাঁচাতে গেলে আমাকে।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হয়। উচ্ছেদ রুখতে গিয়ে বাম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য-সহ বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করেছে পুলিশ।
রবিবার সন্ধ্যা থেকেই যাদবপুরের ২১২ বাসস্ট্যান্ড এবং স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদের আশঙ্কায় থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। যেকোনো রকম আইনশৃঙ্খলার অবনতি রুখতে আগেভাগেই প্রস্তুত ছিল প্রশাসন। এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছিল বিপুল সংখক কলকাতা পুলিশ, রেল পুলিশ (GRP) এবং কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী। উচ্ছেদস্থলের চারিদিকে লোহার ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়, যাতে বহিরাগত কেউ ঢুকতে করতে না পারে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন রেলের বুলডোজারগুলি এগোতে শুরু করে, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বাম-কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা। উচ্ছেদ আটকাতে এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়। বহু আন্দোলনকারী চলন্ত বুলডোজারের সামনে শুয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার সরাসরি মেশিনের ওপরে উঠে পড়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন।
বিক্ষোভকারীদের হঠাতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মৃদু লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ। পুলিশের এই পদক্ষেপের জেরে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় এবং পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। এই ধস্তাধস্তির মধ্যে পড়ে গুরুতর জখম হন বিশিষ্ট নাট্যকর্মী জয়রাজ ভট্টাচার্য। তাঁর মাথায় গভীর আঘাত লাগে বলে জানা গেছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী সামান্য আহত হন।
ঘটনাস্থল থেকে সিপিআইএম (CPIM) নেতা সৃজন ভট্টাচার্যকে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশনের আওতায় একটি পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ভ্যানের ভেতর থেকেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে সৃজন বলেন, “আদালত এবং সমস্ত আইনি প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঝরাতে এই গায়ের জোরের উচ্ছেদ চালাচ্ছে রেল। আমাদের সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে।”
ঘটনাস্থলে বামপন্থী অভিনেত্রী তথা সমাজকর্মী ঊষসী চক্রবর্তী এবং কংগ্রেস নেতা প্রদীপ প্রসাদও উপস্থিত থেকে রেলের এই আকস্মিক পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেন।
ঊষশী চক্রবর্তী বলেন, “অনেক আশা-আকাঙখা নিয়ে সরকার বদল করেছেন। সরকারের সহানুভূতির সঙ্গে এটা বিচার করা উচিৎ। শহরবাসী হিসেবে আমিও চাই রাস্তাঘাট, স্টেশন ঝকঝকে হোক। কিন্তু, যে গরিব মানুষের রুটি-রুজি এখানে যুক্ত তাঁদের আগে পুনর্বাসন করা হোক।”
সিপিএমের তরফে জানানো হয়েছে, সৃজন ভট্টাচার্য সহ মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক রামগড়ের ঋতব্রত ঘোষ। জানা গিয়েছে, জয়রাজ ভট্টাচার্য, সুজন চক্রবর্তীর সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আহত প্রায় ১৫। এদিকে, সৃজন ভট্টাচার্যের মুক্তির দাবিতে রাত তিনটে থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নং গেটের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছেন ছাত্রছাত্রীরা।

আন্দোলনকারী ও বিরোধী নেতৃত্বের অভিযোগ, পুনর্বাসনের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করেই এই উচ্ছেদ অমানবিক। আদালত খোলার পর রেলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে বসার কথা ছিল। সেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাতের অন্ধকারে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, স্টেশন চত্বরের এই দোকান ও নির্মাণগুলি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং রেলের নিজস্ব জমিতে জবরদখল হয়ে ছিল। নিয়মানুযায়ী এবং আইনি পথ মেনেই এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে।