সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কোনও বাধা নেই। সাতঘণ্টা ধরে পুলিশের অনুরোধের পরেও অবস্থান চালানো হয়, সরকারি অফিস ভাঙচুর করা হয় – তবে সে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ নয়। যদি আন্দোলন করার অধিকার থাকে, তবে সারাদিন চাকরির পর বাড়ি ফেরার অধিকার রয়েছে কর্মীদের। যাঁরা বেরোচ্ছিলেন তাঁদের প্রাণ সংশয়ের ঝুঁকি ছিল। বের করার জন্য যতটা বলপ্রয়োগ করার ততটুকু হয়েছে। তা স্বীকার করতে কোনও দ্বিধা নেই।” গতকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকাশ ভবনের সামনে আন্দোলনরত চাকরি হারার শিক্ষক-শিক্ষিকারা পুলিশকে বাধ্য করেছিলেন বলেই পুলিশ লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দিয়ে জানালেন রাজ্য পুলিশের এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সুপ্রতিম সরকার।
চাকরিহারা শিক্ষকদের দফায় দফায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে বিকাশ ভবন চত্বর। বৃহস্পতিবার সকালে যে পরিস্থিতির সূত্রপাত হয়, ২৪ ঘণ্টা পরও সেই একই ছবি দেখা যায় শিক্ষা দফতরের সামনে। বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জ করার অভিযোগ উঠেছে। বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী গুরুতর আহতও হন। এই বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানকুতর শুরু হওয়ার পরে শুক্রবার দুপুরে রাজ্য পুলিশের সদর দপ্তর ভবানী ভবনে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে রাজ্য পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট করলেন রাজ্যের এডিজি আইনশৃঙ্খলা জাভেদ শামিম এবং রাজ্য পুলিশের এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সুপ্রতিম সরকার।
এডিজি সাউথবেঙ্গল সুপ্রতিম সরকার বৃহস্পতিবারের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আন্দোলনকারীরা জোর করে গেট ভেঙে ঢুকে পড়ে। মূল চত্বরে ঢুকে পড়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। তখনও পুলিশ কিছু বলেনি। অনেকেই বলছেন, অসহায় পুলিশ-দর্শক পুলিশ। কিন্তু পুলিশ সচেতনভাবে কিছু করেনি। পুলিশ আন্দোলনকারীদের আবেগের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি দেখিয়েছে।” তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “পুলিশ ধৈর্য ধরেছে। সংযত থেকেছে। গেট ভাঙার সময়ও বলপ্রয়োগ করা হয়নি। ৭ ঘণ্টা ধরে বুঝিয়েছে পুলিশ।”
সেই সঙ্গে সুপ্রতিম সরকার আরও জানান, ওই চত্বরে ৫৫টি সরকারি অফিস আছে। সন্ধ্যার পর সেই সব অফিসের কর্মীরা যখন বেরতে চান, তখন দেড়-২ ঘণ্টা ধরে বারবার মাইকিং করেছে পুলিশ। অফিসের ভিতর থেকে প্যানিক কল আসতে থাকে। এরপরই পুলিশ বলপ্রয়োগ করে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে রাজ্যের এডিজি আইনশৃঙ্খলা জাভেদ শামিম বলেন, “চাকরিহারারা বিকাশ ভবনে ১০ দিন শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিলেন। গতকাল অবস্থান অন্যরকম চেহারা নেয়। দু-আড়াই হাজার লোক চলে আসেন। ব্যারিকেড ভাঙেন। পুলিশ অনুরোধ করলেও শোনেননি। পুলিশকে ধাক্কাধাক্কি করে অবস্থান বিক্ষোভ করেন। কাউকে বেরতে দেবেন না বলেন। পুলিশ সচেতনভাবে কিছু করেনি। পূর্ণ সম্মান দেখিয়ে, ধৈর্য দেখিয়েছে পুলিশ। অ্য়াকশন নিলে গেট ভাঙার সময় করা যেত। ৭ ঘণ্টা ধরে পুলিশ বুঝিয়েছে। বিকাশ ভবনে ৫৫টি দপ্তর, ৫০০-৬০০ কর্মী রয়েছেন। সন্ধের পর তাঁরা বেরতে চান। কিন্তু আন্দোলনকারীরা এককাট্টা বেরতে দেবেন না। পুলিশ তা সত্ত্বেও কিছু করেনি। বুঝিয়েছেন। মাইকিং করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বিকাশ ভবনের ভিতরে অনেকে প্যানিক করতে শুরু করেন। ফোন করেন। একজন সন্তানসম্ভবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাড়ি ফিরতে চান। একজনের মা অসুস্থ। তিনি অসহায়ভাবে ঝাঁপ দেন। পা ভেঙে গিয়েছে। বারবার চেষ্টা করেছি। উচ্ছৃঙ্খল বাধা এসেছে। তারপরেও আমরা বারবার মাইকিং করি। শান্তিপূর্ণ অবস্থানে কোনও বাধা নেই বলি। যারা বিনা দোষে বিকাশ ভবনে আটকে আছেন তাঁদের বেরোতে দেওয়ার কথা বলা হয়। নিরাপদে কর্মীদের ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। তখন আন্দোলনকারীরা পুলিশের উপর আক্রমণ করে। ধাক্কাধাক্কি করে।”

আন্দোলনকারী শিক্ষকদের উপর লাঠিচার্জ নিয়ে বিরোধীরা নানা মন্তব্য করছেন। তাদের পালটা জবাবে এডিজি দক্ষিণবঙ্গ বলেন, “কীসের প্রোটোকল মানা হয়নি। ভিডিও, অডিও রয়েছে। বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও শোনেননি। ধৈর্য ও সংযমের চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছে পুলিশ। যেটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করেছি। সেটা হয়েছে। ১৯ জন পুলিশ জখম হয়েছেন।” এই ঘটনার নেপথ্যে কারও উসকানি রয়েছে বলেই সন্দেহ পুলিশের। এডিজি দক্ষিণবঙ্গ জানান, “যারা উসকানি দিয়েছে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”