সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘‘যেখানেই হাত দেওয়া হচ্ছে… এ তো ব্রিগেড প্যারেড ময়দানকে জেল বানাতে হবে! কেউ আসবেন নবান্নতে। টাইম নিয়ে চা খাওয়াব। যেখানেই হাত দেওয়া হচ্ছে, পচা-দুর্গন্ধ বার হচ্ছে।’’ এভাবেই রবিবার বিগত তৃণমূল সরকারের আমলের দুর্নীতি নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নিউ টাউন কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে মমতার সরকারকে তুলোধনা করে শুভেন্দু জানান, প্রত্যেকটি সরকারি কাজে দুর্নীতি হয়েছে। যে কাজেই হাত দিচ্ছেন, সেখানে দুর্নীতির প্রমাণ মিলছে। মমতার সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডারের উদাহরণ টেনে শুভেন্দু বলেন, ‘‘আমরা প্রতিশ্রুতি মতো অন্নপূর্ণা যোজনা শুরু করেছি। প্রথমে সমালোচনা হয়েছিল। পরে সবাই বুঝেছেন, সরকারি টাকা, ট্যাক্সের টাকা এ ভাবে জলে ফেলা যায় না।’’
মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘‘আগে ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষকে লক্ষ্মীর ভান্ডার দিত সরকার (তৃণমূল)। তার মধ্যে আমরা (বিজেপি সরকার) ২৭ লক্ষ এমন লোককে ধরেছি, যাঁদের ভোটার তালিকায় নামই নেই। সিএএ-তে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের বাদ দিয়ে ২৭ লক্ষ নাম পেয়েছি। আবার ৩ লক্ষ পুরুষ পাওয়া গিয়েছে, যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পেতেন। শুধু মুর্শিদাবাদে এই সংখ্যা সাড়ে চার হাজার। কৃষ্ণনগর একটি অঞ্চলে ২৭৩ জনকে পাওয়া গিয়েছে। ভয়ঙ্কর দুর্নীতি!’’
শুভেন্দু জানিয়েছেন, বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের কাজ শুরু হয়েছে কয়েক দিন আগেই। ৫৫৬ কিলোমিটার জমির মধ্যে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হস্তান্তর হয়ে গিয়েছে। সিএএ-র আওতায় পড়েননি এমন অনুপ্রবেশকারীদের ‘ডিপোর্ট’ করার কাজ শুরু হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের ভাত, আমাদের ওষুধ খেত এরা। আরামে বসে থাকত এখানে। এমন ৪ হাজার ৮০০ জনকে ও পারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হোল্ডিং সেন্টারে ৮৩৬ জন আছেন। তাঁদেরও আমরা খাইয়ে দাইয়ে ও দিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। সীমান্তে সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতেই হবে।’’
রাজ্যে পালাবদল ঘটেছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। তার পর থেকেই প্রশাসনিক স্তরে খোলনলচে বদল শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও অনেক সরকারি আধিকারিকের মধ্যে ‘নেগেটিভ মাইন্ডসেট’ লক্ষ করা যাচ্ছে বলে জানিয়ে তাঁদের উদ্দেশে বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার নিউ টাউনে একটি দলীয় কর্মসূচি থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, যে সব আধিকারিকের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে, তাঁদের সঠিক রাস্তায় আসা প্রয়োজন। তার জন্য দলের জনপ্রতিনিধিদের তো বটেই, সংগঠনের নেতানেত্রীর চোখ-কান খোলা রাখার উপদেশ দিলেন শুভেন্দু।
মুুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলার সরকারের যাঁরা চালিকাশক্তি, অর্থাৎ সরকারি আধিকারিকেরা, তাঁদের সকলকে খারাপ বলব না। কিন্তু তাঁদের মধ্যে দু’ধরনের মাইন্ডসেট কাজ করে, যা সম্পূর্ণ বদলানো প্রয়োজন। সেটা আরও সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে করতে হবে। সরকারি মেশিনারিকে আরও উপযুক্ত করে তুলতে হবে। যাঁরা এখনও নেগেটিভ মাইন্ডসেটে রয়েছেন, তাঁদের সঠিক রাস্তায় আনতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন জনপ্রতিনিধি এবং সংগঠনের সহযোগিতা।’
সকলকে একসঙ্গে নিয়েই এগোনোর বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জোর দিয়েছেন ‘আমি নয়, আমরা’র ভাষ্যে। শুভেন্দু বলেছেন, ‘আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি। প্রত্যেক বিষয়ে উনি নজর দিয়েছেন। অনেক গুরুদায়িত্ব রয়েছে। তা পালন করার চেষ্টা করছি। বাংলা অন্য রাজ্যের তুলনায় আলাদা। এখানকার মানুষ ভীষণ রাজনীতি সচেতন। ১২ মাস এখানে রাজনীতি হয়। আমাদের কর্মীদের মধ্যেও রাজনীতি সচেতন হতে হবে। এর জন্য সরকার, জনপ্রতিনিধি এবং সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ভীষণ প্রয়োজন। সরকারের উদ্যোগ, প্রকল্পের সুবিধা এলাকায় পৌঁছল কি না, রাষ্ট্রবাদের উপর কী কাজ হচ্ছে, সব নজরে রাখবেন। সরকারকে, মুখ্যমন্ত্রীকে খবর দেবেন। না হলে আমাদের এই জয়ের স্বার্থকতা থাকবে না।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘এখন যেখানেই হাত দিচ্ছি, সেখানেই দুর্নীতি। যা অবস্থা, তা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকে জেলখানা বানাতে হবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ২৭ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা ধরেছি। তিন লাখ পুরুষ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেয়েছে। মুর্শিদাবাদেই সাড়ে চার লক্ষ। পুরুষেরাও বিধবা ভাতা পেয়েছে।’ সরকারি এবং প্রশাসন চালানোর কাজে কেন্দ্রের বিপুল সহযোগিতা মিলছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, ‘মোদিজী বলে দিয়েছেন, বাংলাকে সাহায্য করতে হবে। তা মেনে সব মন্ত্রীরা ভীষণ সহযোগিতা করছেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইতে হচ্ছে না। বাংলার ১ কোটি ৪৬ লাখ পরিবার আয়ুষ্মান ভারতের কার্ড পাবেন। কেন্দ্রের মতো রাজ্যেও আয়ুষ দপ্তর খুলতে চলেছি আমরা।’ আগামী ২২ জুন রাজ্য বাজেট। সেখানে নতুন কিছু দেখা যাবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।