পর্যটন, পরিকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে স্মার্ট পার্কিং—উত্তরবঙ্গের পাঁচ শহরকে নতুন রূপে গড়তে কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ উদ্যোগ, জানালেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
উত্তরবঙ্গের ভাগ্য কি এবার সত্যিই বদলাতে চলেছে? পাহাড় থেকে সমতল—পর্যটন মানচিত্রে আরও বড় জায়গা করে নিতে চলেছে শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ও মিরিক। এই পাঁচ শহরকে ‘হিমালয়ান হিল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার বড় ঘোষণা করলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল।
রবিবার উত্তরকন্যায় বর্ষা ও বিপর্যয় মোকাবিলা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী জানান, কেন্দ্রের আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রকের উদ্যোগে উত্তরবঙ্গের এই পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ শহরের জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—পর্যটন, নাগরিক পরিষেবা এবং আধুনিক নগর পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের শহর তৈরি করা।
দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকাগুলিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মতো বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার দাবি উঠছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক দিক থেকে মিল থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রের একাধিক বিশেষ প্যাকেজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এই অঞ্চল। এবার সেই আক্ষেপ অনেকটাই দূর হতে পারে বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের দাবি, কেন্দ্রীয় নগর উন্নয়ন মন্ত্রী মনোহর লাল খট্টর উত্তরবঙ্গের এই পাঁচ শহরকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। সেই অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নগর উন্নয়ন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যটকবান্ধব পরিষেবা তৈরির উপর জোর দেওয়া হবে।
শুধু রাস্তা বা আলো নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। যেসব পরিবারের নিজস্ব জমি রয়েছে কিন্তু শৌচাগার নেই, তাদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বস্তি এলাকায় কমিউনিটি টয়লেট এবং বাজার, বাসস্ট্যান্ডের মতো জনবহুল এলাকায় পাবলিক টয়লেট তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে নজরকাড়া ঘোষণা অবশ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলিকে ঘিরে। দার্জিলিং, মিরিক বা কালিম্পংয়ের মতো পর্যটন শহরে আধুনিক রেস্তোরাঁ ও হোটেলের মানের ‘অ্যাসপিরেশনাল টয়লেট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনের মতে, পর্যটকদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতেই এই উদ্যোগ।
পরিচ্ছন্ন শহর গড়ার লক্ষ্যে প্রযুক্তিকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। রাজ্যে চালু হতে চলেছে একটি বিশেষ ‘স্বচ্ছতা অ্যাপ’। কোনও এলাকায় আবর্জনা পড়ে থাকলে নাগরিকরা ছবি তুলে অ্যাপে আপলোড করতে পারবেন। প্রশাসনের দাবি, অভিযোগ জমা পড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করা হবে।
ইতিমধ্যেই কলকাতা-সহ ১০টি পুরসভায় এই পরিষেবা চালু রয়েছে। আগামী দিনে আরও ৩০টি পুরসভাকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পর্যায়ে এই প্রকল্প কার্যকর হওয়ার কথা।
এছাড়াও বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আবর্জনা সংগ্রহকারী গাড়িতে থাকবে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা, আর বাড়ি বাড়ি চালু হবে QR স্ক্যানিং সিস্টেম। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা এবং নজরদারি সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
শহরগুলিতে স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থাও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট পার্কিং জোন চিহ্নিত করা হবে এবং সেখান থেকে আদায় হওয়া রাজস্ব সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা পড়বে।
পর্যটনের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যেই নতুন নজির গড়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে পর্যটকের সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রেও দেশের শীর্ষ রাজ্যগুলির মধ্যে উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ। সেই সাফল্যের উপর ভর করেই এবার উত্তরবঙ্গকে আরও বড় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সূত্রের খবর, এই ‘হিমালয়ান হিল সিটি’ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে প্রায় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে শুধু পর্যটন নয়, কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং নগর অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলের এই পাঁচ শহরকে ঘিরে এখন নতুন প্রত্যাশা। তবে ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রকল্পের কাজ কত দ্রুত শুরু হবে, আর বাস্তবে কতটা বদলে যাবে উত্তরবঙ্গের চেহারা? এখন সেই দিকেই তাকিয়ে পাহাড় থেকে সমতল।