সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
রথযাত্রা, লোকারণ্য মহা ধুমধাম। রথযাত্রা! শুধু একটি উৎসব নয়, এ এক আবেগ। আর এবার কলকাতার ইসকন রথযাত্রা ভক্তদের জন্য আনছে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। গত ৪৮ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে এবার ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার রথ ধীর গতিতে এগিয়ে যাবে সুখোই যুদ্ধবিমানের টায়ারে চড়ে! দীর্ঘদিনের বোয়িং বিমানের চাকার বদলে এই নতুনত্ব রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে কলকাতা রথযাত্রায় বোয়িং বিমানের টায়ার ব্যবহার করা হচ্ছিল। কিন্তু এই টায়ারগুলো অনেক পুরনো হয়ে গিয়েছিল এবং গত ১৫ বছর ধরে ইসকন কর্তৃপক্ষ নতুন টায়ারের খোঁজ করছিল, কারণ বোয়িং টায়ার এখন পাওয়া খুবই কঠিন।
সুখোই টায়ারের খোঁজে ইসকন: এক অবাক করা কাহিনি
ইসকনের মুখপাত্র রাধারমন দাস জানিয়েছেন, সুখোই যুদ্ধবিমানের টায়ারের ব্যাস বোয়িংয়ের টায়ারের মতোই, যার কারণে এ বছর রথে সুখোই টায়ার লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনের প্রক্রিয়াটিও বেশ আকর্ষণীয় ছিল।
ইসকন তরফে জানা গিয়েছে, এই রুশ বিমানের চাকা লাগানোর পর ১.৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় চলতে সক্ষম হবে রথগুলি। শনিবার এই চাকা লাগানোর পর পরীক্ষামূলক ভাবে রথগুলিকে চালিয়ে দেখাও হয়ে গিয়েছে। গত চার দশকের বেশি সময় ধরে কলকাতার ইসকনের রথযাত্রায় ব্যবহৃত তিন রথে বোয়িং-৪৭৪ বিমানের চাকা ব্যবহার করা হত। যা তৈরি করত ডানলপ কোম্পানি। কিন্তু তাও তারা পরবর্তীতে বন্ধ করে দেওয়া সংকটে পরে ইসকনের রথযাত্রা। ক্ষয়ে আসা চাকা নিয়ে বাড়তে থাকে চিন্তা।
সেই সময়ই নতুন চাকার খোঁজে যোগাযোগ করা হয় এমআরএফ-এর সঙ্গে। যারা ভারতীয় বায়ুসেনাকে রুশ যুদ্ধবিমান সুখোইয়ের চাকা প্রদান করে থাকে। এই প্রসঙ্গে ইসকনের সহ-সভাপতি রাধারমন দাস জানান, ‘আমি যখন এমআরএফ-কে সুখোই টায়ার রথের জন্য তৈরি করার কথা জানাই, ওরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। এমনকি, ওরা রথের জরিপ করতে কলকাতাতে লোকও পাঠিয়েছিল।’ তাঁর সংযোজন, ‘ওরা যখন দেখে এই তিন রথ গত ৪৮ বছর ধরে বোয়িং বিমানের চাকায় চলছে, তখন তারা রাজি হয়ে যায়। পাশাপাশি, আমরা ওদের জানাই, এই বোয়িংয়ের সম্পূর্ণ বিকল্পই সুখোইয়ের চাকা। তাই সেটাই দরকার।’
রাধারমন দাসের মতে, যখন ইসকন সুখোই টায়ার প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাছে কোটেশন চেয়েছিল, তখন কোম্পানিটি রীতিমতো অবাক হয়ে যায়। তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন ছিল যে, কেন কেউ তাদের যুদ্ধবিমানের টায়ারের জন্য কোটেশন চাইছে, তাও আবার রথযাত্রার মতো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য! এরপর, ইসকন কোম্পানিকে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এবং তাদের একটি দলকে কলকাতায় ডেকে পাঠায়, এমনকি রথটিও দেখায়। এই সবকিছু দেখে নিশ্চিত হওয়ার পরই কোম্পানিটি ইসকনকে চারটি সুখোই টায়ার সরবরাহ করতে রাজি হয়। বর্তমানে, এই টায়ারগুলি রথে লাগানোর কাজ চলছে।
ইসকনের মুখপাত্র আরও জানিয়েছেন যে, এই বছরের রথযাত্রায়, সুখোই টায়ার দিয়ে সজ্জিত রথে চড়ে ভক্তদের দর্শন দেবেন ভগবান জগন্নাথ। এটি কেবল প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বড় পরিবর্তনই নয়, এটি ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার এক অনন্য মিশ্রণেরও প্রতীক।

২০২৫ সালে জগন্নাথের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে ২৭ জুন। এর প্রস্তুতি অবশ্য অনেক আগে থেকেই শুরু হয় এবং কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। পুরো উৎসবটি বেশ কয়েক দিন ধরে চলে এবং নির্দিষ্ট তারিখে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এই যাত্রার একটি তাৎপর্য হল, সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ নির্বিশেষে দেবতার দর্শন করতে পারেন এবং শোভাযাত্রাতেও অংশগ্রহণ করতে পারেন। এবার সুখোইয়ের ছোঁয়ায় রথযাত্রা আরও এক নতুন মাত্রা পেতে চলেছে, যা ভক্তদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।