সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
নতুন যুগের সূচনা তৃণমূলে। প্রবীণ নেতার জায়গায় নবীন নেতৃত্বকে এগিয়ে আনার পথে বড় পদক্ষেপ নিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। এতদিন এই দায়িত্বে ছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার তৃণমূলের সাংসদদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেন মমতা। সেখানেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ এই রদবদলের কথা জানান। সুদীপের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও সংসদে অনুপস্থিতি এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় কারণ হলেও, রাজনৈতিক মহলের মতে, বিষয়টি এরচেয়েও অনেক গভীর।
তৃণমূলের অভ্যন্তরে বহুদিন ধরেই প্রবীণ ও নবীন নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য ও অবস্থান নিয়ে জল্পনা চলছিল। সেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও একাধিকবার বলেছেন, বয়স ও কর্মক্ষমতা বিবেচনায় দলের নেতৃত্বে বদল সময়ের দাবি।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানে শারীরিকভাবে দুর্বল। চলতি বাদল অধিবেশনে তিনি একদিনও সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। এ বিষয়ে মমতা বৈঠকে বলেন, সুদীপ যেন পূর্ণ বিশ্রাম নেন এবং সংসদীয় দায়িত্ব আপাতত অভিষেক সামলান।
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব বহুদিন ধরেই দক্ষভাবে সামলাচ্ছেন। এবার তাঁর কাঁধে পড়ল সংসদীয় দলে নেতৃত্বের ভার। এমন একটি পদ, যেটি শুধু সাংসদদের নেতৃত্ব দেওয়াই নয়, জাতীয় রাজনীতিতে দলের অবস্থান নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও অভিষেকের তুলনায় লোকসভায় অভিজ্ঞ ও বহুবার নির্বাচিত সাংসদ রয়েছেন, তবুও তাঁদের নয়, ডায়মন্ড হারবারের নবীন সাংসদকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এটা নিছক আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়, বরং দলের ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের স্পষ্ট বার্তা।
তৃণমূলের প্রবীণ নেতা সৌগত রায় বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি। সুদীপ অসুস্থ। এই অবস্থায় অভিষেককে সামনের সারিতে আনার সিদ্ধান্ত দলকে তরুণ নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনর্গঠনের চেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, অন্যান্য প্রবীণ নেতাদের ক্ষেত্রেও কি একই নীতি প্রয়োগ করা হয়।
গত কয়েক মাসে অভিষেক আবারও দলের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সমাজমাধ্যমে। তিনি দিল্লিতে দলের মুখপাত্র, এবং দলের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বেও যুক্ত।
পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানার পরে সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলে তৃণমূলের হয়ে তিনিই অংশ নেন। শুরুতে কেন্দ্র ইউসুফ পাঠানকে মনোনয়ন দিলেও, মমতা নিজে অভিষেককেই মনোনীত করেন। কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয় তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেখালেন, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের রূপরেখা এখন স্পষ্ট। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল সাংগঠনিক দায়িত্বে নয়, সংসদীয় রাজনীতিরও মুখ। লোকসভায় কে কখন কী বিষয়ে কথা বলবেন, তাও এখন থেকে অভিষেকই নির্ধারণ করবেন।
দলীয় ভিতকে আরও মজবুত করতে এবং আগামী নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলতে এই পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
তৃণমূল কংগ্রেসে এই রদবদল নিছক পরিবর্তন নয়, বরং এক বৃহৎ রাজনৈতিক বার্তা। প্রবীণদের সম্মান রেখে, নবীনদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার মাধ্যমে দল ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এখন শুধু একজন সাংসদ বা সাংগঠনিক মুখ নন, সংসদীয় রাজনীতিতে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ারও প্রধান সেনানায়ক।
মুখ্যসচেতকের পদ ছাড়লেন কল্যাণ
তৃণমূলের সংসদীয় দলের ভার্চুয়াল বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের নেতা ঘোষণা করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লোকসভায় তৃণমূলের মুখ্যসচেতকের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কল্যাণের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তৃণমূলের অন্দরে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, এবং তাঁর পদত্যাগের কারণ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। বিশেষ করে কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সংঘাতের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, “মমতাদি অভিযোগ করেছেন লোকসভায় সমন্বয় ঠিক মতো হচ্ছে না, ফলে আঙুল তো আমার দিকে তোলা হচ্ছে। তাই আমি ছেড়ে দিলাম।” ক্ষুব্ধ কল্যাণ আরও অভিযোগ করেন, “দিদি বলছেন ঝগড়া করছে। যাঁরা আমাকে গালাগাল দেয় আমি কি সহ্য করব? দলকে জানিয়েছি, দল তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না করে উল্টে আমাকেই দোষারোপ করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভালো ভাবে দল চালাক। লোকসভায় ভালো করে দল চলুক।” মহুয়া মৈত্রের মন্তব্যে তাঁর হতাশা এবং দল কর্তৃক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাঁর ক্ষোভ স্পষ্টতই ধরা পড়েছে তাঁর কথায়।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিযোগ করেন যে, একজন আইনজীবী হিসেবে তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার দায়িত্ব সামলাতে হয়, আবার একই সাথে সংসদে মুখ্যসচেতকের গুরুদায়িত্বও পালন করতে হয়। তিনি বলেন, “সব দায় দায়িত্ব কি একা নেবো? সংসদে কেউ থাকেন না। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ, দিনের পর দিন আসেন না, কাকলি মাঝেমধ্যে থাকেন। কেউ কেউ শাড়ি পরে সেজেগুজে এসে নরেন্দ্র মোদি মুর্দাবাদ বলে চলে যান। আমাকে রাজ্য সরকারের মামলা সামলাতে হবে, এসএসসি, ওবিসি মামলা সব দেখতে হবে, আবার সাড়ে দশটা থেকে সংসদে থাকতে হবে, এটা তো হয়না।”
ক্ষুব্ধ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যেই ডেপুটি স্পিকার এবং লোকসভায় দলের উপনেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে বলে এসেছেন যে, এবার থেকে সংসদে যেন তাঁকে পিছনের সারিতে কোনো আসন দেওয়া হয়।
তবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে, তাঁর পদত্যাগের সাথে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। শ্রীরামপুরের এই সাংসদ বলেন, “দিদি যখন ঠিক করেছেন অভিষেক যোগ্য তাহলে নিশ্চয়ই সমন্বয় ভালো হবে। আমি কোনো অন্যায় কথা মানতে পারব না। তাতে রাজনীতি ছাড়তে হলে ছেড়ে দেবো। অভিষেকের সঙ্গে আমার কোনো মতবিরোধ নেই। আমার সঙ্গে যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক।” অভিমানী কল্যাণকে বলতে শোনা যায়, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেদিন বলবেন, রাজনীতি ছেড়ে দেব। দিদি বলেছেন, লোকসভায় সমন্বয় হচ্ছে না, আমি আমার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি।”
সূত্রের খবর অনুযায়ী, এদিনের বৈঠকের শুরুতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভায় দলের কয়েকজন সাংসদের মধ্যে চলমান ব্যক্তিগত সংঘাত নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি এও মন্তব্য করেন যে, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দলনেতার দায়িত্বে থাকার সময় এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।