সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ যা এখনো পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কাছে জমা পড়েছে তা থেকে প্রমাণিত যে সোনালী খাতুন এবং তার পরিবারগত কয়েক প্রজন্ম ধরেই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা। জন্মসূত্রে যিনি ভারতীয় তার মেয়ে যখন ভারতে জন্মেছে সে বাংলাদেশি কিভাবে হয়ে গেল? অবিলম্বে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া সোনালি খাতুনকে ভারতে ফিরিয়ে আনুন।’ এভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বাংলাদেশী সন্দেহে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া বীরভূমের অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুনকে ভারতে ফেরানোর নির্দেশ দিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। তারপরেই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে দেশের সলিসিটর জেনারেল প্রধান বিচারপতিকে জানালেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে কেন্দ্রীয় সরকার বীরভূমের বাসিন্দা সোনালী খাতুনকে অবিলম্বে ভারতে ফেরানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দিল্লিতে ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি ভারতীয় কি না, তা যাচাই করে দেখা হবে। এরপরই কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত। তবে সলিসিটর জেনারেলের তরফে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতির কথা জানানো হলেও প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সোনালী খাতুনকে দিল্লি থেকে গ্রেফতার করে বাংলাদেশে পাঠানো হলেও তিনি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের বাসিন্দা এবং তার পরিবারের বাকিরা ও যেহেতু সেখানেই থাকেন তাই বাংলাদেশ থেকে অবিলম্বে সোনালী খাতুনকে ফিরিয়ে এনে মানবিক কারণেই অন্তঃসত্ত্বা সোনালীকে পৌঁছে দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে।
সোনালি খাতুন ও তাঁর সন্তান সাবিরকে শুধু দ্রুত দেশে ফেরানোই নয় পাশাপাশি বীরভূমে তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার এই মামলার শুনানিতে কেন্দ্রের জেনারেল তুষার মেহতা জানান সরকারি নিয়ম মেনেই সোনালিদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এদিনের শুনানিতে এজলাসে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। সোনালির নাগরিকত্ব সংক্রান্ত পরিচয় নিয়ে কেন্দ্রের পদক্ষেপে যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করেন তিনি। প্রশ্ন বলেন, ‘মামলাকারী শেখ ভারতীয় নাগরিক নন- এ কথা একবারও বললেনি। অর্থাৎ, ভদু শেখ ভারতীয়। তাঁর সন্তান সোনালি ভারতীয় নাগরিক হতে পারেন। ভারতের নাগরিকত্বের যে নিয়ম রয়েছে সেই অনুযায়ী তো আপনারা কাজ করেননি।’ উল্লেখ্য সোনালীর বাবা ভোদু শেখ যে পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা তার প্রমাণ আগেই প্রকাশ্যে এনেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সিইও ওয়েস্ট বেঙ্গল পোর্টালে উপলব্ধ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বীরভূমের মুরারাই বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার হিসেবে ভোদু শেখ এবং জ্যোৎস্না বিবিকে দেখানো হয়েছে। দম্পতির ভোটকেন্দ্র ছিল পাইকার প্রাথমিক বিদ্যালয়, রুম নং ৩। তালিকায় ভোদুর বাবার নাম হাতিম তাই শেখ উল্লেখ করা হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী সোনালিকে জন্মসূত্রে ভারতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হলে, নাগরিকত্ব আইন অনুসারে, বাবা-মায়ের মধ্যে অন্তত একজনকে সেই সময়ে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। দিল্লি পুলিশ ২১ জুন সোনালি, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ এবং তাদের ৮ বছর বয়সী ছেলেকে কেএন কাটজু মার্গ থেকে গ্রেফতার করে, আধার কার্ড এবং অন্যান্য নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের অবৈধ বলে ঘোষণা করেছিল।

বুধবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তও কেন্দ্রের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা আপনাদের কাজে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু আপনাদের পদ্ধতি ঠিক নেই।’ বুধবার শুনানি চলাকালীন সোনালির যাবতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবার দিকে নজর দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সুপ্রিম আদালত।দেশে ফিরিয়ে আনার পরে মানবিক কারণে সব রকম চিকিৎসার সুবিধা দিতে হবে সোনালিকে। তিন চিকিৎসকের দল চিকিৎসা করবে।বীরভূমের চিফ মেডিকেল অফিসারকে সোনালির চিকিৎসার যাবতীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁর চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করতে হবে রাজ্য সরকারকে, নির্দেশ প্রধান বিচারপতির।বাংলাদেশে থাকা বাকি চারজনকে দেশে ফেরানো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে আদালতে। আগামী ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে পরবর্তী শুনানি হবে।