সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনীতির ময়দানে স্পষ্ট বার্তা দিতে পুরুলিয়ার মাটিতে রণ সংকল্প যাত্রায় নামলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবারের সভা থেকে একদিকে যেমন বিরোধীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন, তেমনই নিজের দলের নেতা-কর্মীদের জন্যও ছাড়লেন কঠোর সতর্কবার্তা। মূল সুর একটাই—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনও আপস নয়।
সভামঞ্চ থেকেই অভিষেক সরাসরি সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আবেদন জানান। বলেন, এলাকার কোনও তৃণমূল নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে যদি তোলাবাজি, হুমকি বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, তাহলে আর চুপ করে থাকার দরকার নেই। ফোন করুন নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বরে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, দলের নাম ভাঙিয়ে টাকা চাওয়া বা মানুষকে ভয় দেখানো কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
ভোটের মুখে বড় ঘোষণা করে অভিষেক জানান, আগামী ১০ দিনের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আরও ২০ লক্ষ মানুষকে আবাসের ঘর তুলে দেবে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে তাঁর বক্তব্য, “কেন্দ্র টাকা আটকে রাখলেও রাজ্য সরকার মানুষের পাশে দাঁড়াবে।” এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, গরিব মানুষের মাথার উপর ছাদ দেওয়াই সরকারের অগ্রাধিকার।
একই সঙ্গে দলের স্থানীয় নেতৃত্বের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন অভিষেক। সভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, “তৃণমূলের কোনও স্থানীয় পদাধিকারী যদি আপনাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, আমাকে জানাবেন। এক ডাকে অভিষেকে ফোন করুন। আমি তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনারা দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।” তাঁর সংযোজন, ২০২৬ সালে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পুরুলিয়াবাসীর উদ্দেশে বিশেষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিষেক বলেন, জেলার বিভিন্ন ব্লকের দাবি-দাওয়া তিনি নিজে নোট করে রেখেছেন। “পুরুলিয়া ৯-০ হবে, আর ছ’মাসের মধ্যে কাজ করে দেখাব”—এই কথার মাধ্যমে তিনি কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতির বার্তা দেন।
বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে অভিষেকের কটাক্ষ আরও তীব্র হয়। সুকান্ত মজুমদার ও শুভেন্দু অধিকারীদের নাম না করে তিনি বলেন, “আজ বড় বড় কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না থাকলে এই এলাকায় মাওবাদী আর বাম অত্যাচারে মানুষ শান্তিতে থাকতে পারত না।” তাঁর দাবি, রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকার কারণেই এখন বাংলায় এসে কেন্দ্রের নেতারা বক্তৃতা দিচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলা প্রসঙ্গেও অভিষেক বলেন, এই লড়াই জিতেছে বাংলার মানুষ। তৃণমূল কংগ্রেসের দায়ের করা মামলার ফলেই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা প্রকাশের নির্দেশ এসেছে। বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “ওরা শুধু বড় বড় ভাষণ দেয়। কাজের বেলায় কিছুই নেই।”
এই সভা থেকেই ‘এক ডাকে অভিষেক’ কর্মসূচির সম্প্রসারণ ঘোষণা করেন তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চালু করা হয়েছে হেল্পলাইন নম্বর—৭৮৮-৭৭৭৮৮৭৭। অভিষেক জানান, তোলাবাজি বা হুমকির ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে সেই মুহূর্তের ভিডিয়ো করে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে হবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে পুরস্কার মিলবে, আর মিথ্যে অভিযোগ হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিষেক স্পষ্ট করে দেন, কেউ চাইলে নিজের পরিচয় গোপন রেখেও অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেবে দল। বার্তা একেবারে পরিষ্কার—দলের নাম ভাঙিয়ে অন্যায় করলে রেহাই নেই, সে যত বড় নেতাই হোক না কেন।
দলের নাম করে ভয় দেখানো, টাকাপয়সা চাওয়া, কাজের দেরি করা— এ রকম নানাবিধ অভিযোগ পাওয়া গেলে কি করা হবে সেই প্রসঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এটা বরদাস্ত করব না। অভিষেক বলেন, ‘‘আপনাদের কাছে কেউ টাকা চাইলে, হুমকি দিলে একটা ভিডিয়ো করে হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে দিন। আমরা পুলিশকে ফরওয়ার্ড করে দেব। অনেকে আছেন, যাঁরা অভিযোগ জানানোর পর নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চান। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।’’