সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সামগ্রিক আর্থ সামাজিক উন্নয়নের দিকে নজর রেখে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলো রাজ্যের অন্তর্বর্তী বাজেটে। একদিকে যেমন সমাজের সর্বস্তরের কর্মীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি হয়েছে ঠিক তেমনভাবেই বাজেটে রয়েছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের দিশা। সেই সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির জন্য স্থায়ী পরিকাঠামো বৃদ্ধিতে বিপুল অংকের বরাদ্দ।
সামনেই বাংলায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। মমতার নেতৃত্বে তৃতীয় তৃণমূল সরকারের শেষ বাজেট অধিবেশন ছিল আজ। প্রথা অনুযায়ী নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী বাজেট বা ভোট অন অ্যাকাউন্ট বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে পেশ করলেন রাজ্যের অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বাজেট পেশ এর আগে সর্বভারতীয় নিরিখে বাংলা কিভাবে মমতার নেতৃত্বে 2011 সাল থেকে সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতির পাশাপাশি বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং বেকারত্বের হার কমিয়েছে তা নিজের ভাষণে তুলে ধরেন বাংলার রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস।
এরপরেই বিধানসভায় ৪০৬০৮৪.১৭ কোটি অর্থাৎ প্রায় ৪ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকার অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। এই বাজেটকে কর্মসংস্থানমুখী এবং বাংলার মানুষকে স্বনির্ভর করে তোলার উপযোগী বাজেট বলে স্বাগত জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা
আজ রাজ্য বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। গোটা দেশে ইতিমধ্যেই মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া লক্ষ্মীর ভান্ডারে মহিলাদের জন্য মাসিক ভাতা বাড়ল ৫০০ টাকা হারে। এছাড়াও বেতন বৃদ্ধি হল আশা কর্মী, আইসিডিএস প্রকল্পে অঙ্গনওয়াড়ি এবং সহকারীদের, প্যারা টিচার, সিভিক ভলেন্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ এবং গ্রীন পুলিশের বেতন বাড়লো ১০০০ টাকা করে। সেই সঙ্গে বাংলার ১৮ বছর থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য বাংলার যুব সাথী প্রকল্পে মাসে ১৫০০ টাকা করে বেকার ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা হল।
বাংলার যুব সাথী প্রকল্প
মাধ্যমিক পাস অথবা সমতুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং রাজ্য সরকারের থেকে যারা কোনও স্কলারশিপ নেবেন না, এদের ক্ষেত্রে এই সাহায্য করা হবে। মাসে ১৫০০ হাজার টাকা এই যুবুক যুবতীদের দেওয়া হবে, তাঁদের আর্থিক সাহায্যের জন্য। ৫ বছর জন্য সর্বোচ্চ এই সাহায্য কিন্তু তাঁরা পাবেন। ২১ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত যুবক যুবতীদের আর্থিক সাহায্য করা হবে। আগামী ১৫ অগাস্ট ২০২৬ থেকে এই প্রকল্প চালু হবে। ৫ হাজার কোটি টাকা এর জন্য ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে।
৪ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি
রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের জন্য ৪ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। আগামী ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, এপ্রিল মাসের বেতনের সঙ্গেই বর্ধিত ৪ শতাংশ ডিএ যুক্ত হয়ে কর্মীদের হাতে আসবে। এর পাশাপাশি রাজ্যে সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথাও ঘোষণা হয় বাজেটে।
লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পে ৫০০ টাকা বৃদ্ধি
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি। তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা পান মাসে ১২০০ টাকা। এবার থেকে সাধারণ শ্রেণিভুক্ত মহিলারা পাবেন ১৫০০ টাকা করে। আর তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা পাবেন মাসে ১৭০০ টাকা। চলতি মাস থেকেই এই বর্ধিত ভাতা পাবেন উপভোক্তারা।
পেনশনভোগীদের জন্য বিরাট উপহার
প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, যদি কোনো পেনশনভোগীর চিকিৎসার বিল ২ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে, তবে তাঁকে আর সম্পূর্ণ বিপদে পড়তে হবে না। ২ লক্ষ টাকার পরবর্তী যে অতিরিক্ত খরচ হবে, তার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশলেস সুবিধা হিসেবে কভার করবে সরকার।
বেতন বৃদ্ধি সর্বস্তরে
মাসিক ১০০০ টাকা করে ভাতা বৃদ্ধি হয়েছে আশা কর্মী, আইসিডিএস প্রকল্পে কর্মরত অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি সহায়ক, প্যারা টিচার, শিক্ষা বন্ধু, সহায়ক সহায়িকা, সম্প্রসারক, মুখ্য সম্প্রসারণ সহ স্পেশাল এডুকেটর ও ম্যানেজমেন্ট স্টাফ, সিভিক ভলেন্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রীন পুলিশের। আশাকর্মীদের জন্য ৫ লক্ষ টাকার বিমারও ঘোষণাও করা হয়েছে। কর্মরত অবস্থায় কোনও আশাকর্মী মারা গেলে তাঁর পরিবারকে এককালীন পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং সহায়কদের মৃত্যু হলে পরিবারকে ৫ লাখ ক্ষতিপূরণের কথাও বলা হয়েছে এই বাজেটে।
গিগ কর্মীদের জন্য ঘোষণা
গিগ অর্থনীতি বা অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত বিশাল সংখ্যক কর্মীদের এবার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প স্বাস্থ্য সাথীর আওতায় আনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে।
মহাত্মাশ্রী প্রকল্প
১০০ দিনের কাজের প্রকল্প থেকে কেন্দ্রের মোদি সরকার মহাত্মা গান্ধীর নাম ছেটে দেওয়ার পরেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন গান্ধীজিকে সম্মান জানিয়ে বাংলার কর্ম শ্রী প্রকল্পের নাম হবে মহাত্মা শ্রী প্রকল্প। এই প্রকল্পে 100 দিনের কাজ নিশ্চিত করার জন্য ২০০০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ হয়েছে।
কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে পরিকাঠামো উন্নয়ন
কর্মসংস্থানের জন্য জলপাইগুড়ি জেলায় দুটি এবং বীরভূম বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদের একটি করে মোট পাঁচটি নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি হবে। রাজ্য সরকারি জমিতে যৌথ উদ্যোগে তৈরি হবে গ্লোবাল ট্রেড সেন্টার। রাজ্যে স্থায়ী পরিকাঠামো এবং ব্যবসার উন্নতির জন্য তৈরি হচ্ছে ৬ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড ইকনোমিক করিডর। রাজ্যজুড়ে তৈরি হবে ৫০ নতুন কোল্ড স্টোরেজ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে টেলি অ্যাকাডেমিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে কালচারাল সিটি বা সংস্কৃতি শহর। হাওড়ার ডুমুরজলায় খেলাধুলার উন্নতির জন্য তৈরি হচ্ছে স্পোর্টস সিটি।

রাজ্যজুড়ে আধুনিক শহর তৈরীর ঘোষণা
বাংলা জুড়ে ছোট এবং মাঝারি শহরগুলিকে অত্যাধুনিক মানের গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মমতার সরকার। যেখানে শহরগুলি ব্যবসা পরিবেশ ও কর্মসংস্থান বান্ধব হবে এবং আধুনিক জীবনযাত্রার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধে থাকবে ও ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একটি বড় ভূমিকা থাকবে। এই তালিকায় রয়েছে হাওড়া ডায়মন্ড হারবার বর্ধমান দুর্গাপুর বোলপুর কৃষ্ণনগর বারাসাত রায়গঞ্জ শিলিগুড়ি বহরমপুর মালদা কল্যাণী শ্রীরামপুর অন্ডাল বাঁকুড়া পুরুলিয়া দিঘা মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম, নিউ টাউনের এনকেডিএ এলাকা, গঙ্গারামপুর কোচবিহার জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ার ও দার্জিলিং।