বিতস্তা সেন। কলকাতা সারাদিন।
”বড়দের প্রণাম, ছোটদের ভালবাসা, জয় মা কালী, জয় মা দুর্গা।” এভাবেই বাংলার সংস্কৃতি এবং বাংলার দেবদেবীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে দুর্গাপুরের জনসভা থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
সভামঞ্চে প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরীয় পরিয়ে, দুর্গা ও কালীমূর্তি, বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা ঘোড়া এবং গণেশমূর্তি উপহার দিয়ে স্বাগত জানান শুভেন্দু অধিকারী ও রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও।
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “বিজেপি বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলতে চায়। বাংলা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বিধানচন্দ্র রায়ের মাটি। পশ্চিমবঙ্গ দেশকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়েছে। বাংলার এই মাটি প্রেরণায় পূর্ণ। এখানকার তৃণমূল সরকার বাংলার উন্নয়নে দেওয়াল হয়ে দাঁডিয়েছে। যেদিন তৃণমূল সরকারের দেওয়াল ভাঙবে , সেদিন থেকেই বাংলা বিকাশের পথে এগোবে। তৃণমূল সরকার গেলেই বাংলায় আসল পরিবর্তন হবে।”
আজকের জনসভার আগে সরকারি অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে একদিকে যেমন বাংলার জন্য বিপুল অংকের প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী, দেখতে এমন ভাবেই রীতিমতো হোমওয়ার্ক করে এসে শিক্ষা দুর্নীতি থেকে শুরু করে নারী সুরক্ষা এবং শিল্পে বাংলার শোচনীয় পরিণতির বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙ্গালীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামতে শুরু করেছেন সেই অভিযোগ মমতার নাম না করেই উড়িয়ে দিয়েছেন মোদি। সেই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের লড়াই অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজ্যে অপরাধ ও নারী-নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে এবং প্রশাসন রাজনৈতিক স্বার্থে নীরব দর্শকের ভূমিকা নিচ্ছে। এদিনের সভা থেকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও কসবাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, “বাংলার হাসপাতালও মেয়েদের জন্য সুরক্ষিত নয়। সেই সময়ও দেখা গিয়েছে কীভাবে তৃণমূল অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এরপর কলেজেও একটি মেয়ের উপর চরম অত্যাচার চলে। তাতেও দেখা গিয়েছে তৃণমূলের লোকজন জড়িত।” মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক অশান্তি নিয়েও এদিনের সভা থেকে ফের রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পুলিশ ও প্রশাসনকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘সেখানে পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। বাংলায় আজ আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। তৃণমূলের গুন্ডাগিরির জন্য বিনিয়োগকারীরা ভয় পান। সিন্ডিকেটরাজ, কাটমানি—এই সবই বাংলাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।’
রাজ্যের দুর্নীতি, অনুন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও তথাকথিত ‘গুন্ডা ট্যাক্স’ প্রসঙ্গে তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন মোদী। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘বাংলার সংস্কৃতির এত ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, তৃণমূল সরকারের শাসনে দুর্নীতিই দিশা দেখাচ্ছে। এই বাংলা তো এমন ছিল না। বাংলার যুবসমাজ শান্তি, কাজ, সুশাসন চায়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক সময় বাংলা দেশের বাণিজ্যে দিশা দেখাত। অথচ আজ এখানকার ছেলেমেয়েদের ছোট ছোট চাকরির জন্যও বাইরে যেতে হচ্ছে। তৃণমূল সরকার যত দিন থাকবে, তত দিন শিল্প আসবে না, কর্মসংস্থান হবে না।’ বাংলায় বললেন, “টিএমসি যাবেই, বাংলায় আসল পরিবর্তন আসবেই। এটা মোদির গ্যারেন্টি।”
তিনি জানান, দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট-সহ একাধিক শিল্প ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো হবে। বাংলায় স্লোগান তোলেন, ‘তৃণমূল হঠাও, বাংলা বাঁচাও’। মোদীর বার্তা, ‘পশ্চিমবঙ্গকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এখানে নতুন বিনিয়োগ আসে, নতুন উদ্যোগ তৈরি হয়। বাংলার যুবকদের ভবিষ্যতের জন্য এখনই তৃণমূলকে সরানো জরুরি। তাঁর দাবি, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলা দেশের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত হবে।’
শুধু শিল্প নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও রাজ্যের তীব্র অবনতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মোদী। তাঁর অভিযোগ, ”তৃণমূলের জমানায় প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা—সব রসাতলে যাচ্ছে।” তিনি বলেন, ”মুর্শিদাবাদের মতো ঘটনা ঘটলে পুলিশ পক্ষপাতিত্ব করে। আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, তৃণমূলের গুন্ডাগিরির জন্যই এখানে উদ্যোগপতিরা আসেন না। সিন্ডিকেটরাজ দেখেই পালিয়ে যান বিনিয়োগকারীরা। প্রাথমিক -উচ্চশিক্ষা তৃণমূল জমানায় সব শেয হয়ে গিয়েছে। তৃণমূল বাংলাকে শিল্পোন্নত হতে দিচ্ছে না। বিজেপি ক্ষমতায় এলেই বাংলা দেশের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্য হয়ে উঠবে। পশ্চিমবঙ্গকে এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে, এখানে নতুন বিনিয়োগ আসে। কর্মসংস্থান তৈরি হয়।”
অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গও টেনে আনেন মোদী। কড়া ভাষায় বলেন, “তৃণমূল নিজের স্বার্থে বাংলার পরিচয়কেই সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। অনুপ্রবেশে উৎসাহ দিচ্ছে, তাদের ভুয়ো পরিচয়পত্র বানিয়ে দিচ্ছে। পুরো ইকো সিস্টেম নষ্ট করে দিয়েছে। শুধু বাংলা নয় গোটা দেশের জন্য এটা বিপজ্জনক। তুষ্টিকরণের জন্য তৃণমূল সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে। কান খুলে শুনে রাখুন, সংবিধান অনুযায়ী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।”
৩৪ মিনিটের ভাষণে একাধিকবার ‘মোদী গ্যারান্টি’র কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিকশিত বাংলা মোদীর গ্যারান্টি। বিকশিত বাংলা বিজেপির সঙ্কল্প। এটা পশ্চিমবঙ্গের নবজাগরণের মুহূর্ত। সবাই মিলে নতুন সকাল আনতে হবে। পরিবর্তনের নতুন পদ্ম ফোটাতে হবে। তবেই বাংলার বিকাশ সম্ভব।”
দুর্গাপুর থেকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র বার্তা
শুক্রবার বঙ্গ সফরে এসে রাজ্যের জন্য একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দুপুর ২টা ৩৭ মিনিটে পশ্চিম বর্ধমানের অণ্ডাল বিমানবন্দরে নামেন। সেখান থেকে দুর্গাপুরে সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মোট ৫৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন দুর্গাপুরে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সড়ক ও রেল খাতে একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের শিলান্যাস, উদ্বোধন ও জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুর্গাপুর স্টিল সিটির পাশাপাশি উৎকর্ষ শ্রমেরও কেন্দ্র। আজ এখানে ৫৪০০ কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন হল। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ পরিকাঠামো শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া, মেক ফর দ্য ওয়ার্ল্ড’ এই মন্ত্রেই এগোচ্ছে দেশ ও রাজ্য।” মোদী জানান, দেশে এখন পরিকাঠামো উন্নয়নের বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে। ৪ কোটি গরিব পরিবারকে ঘর, প্রতিটি ঘরে জল, রাস্তাঘাট, সড়ক, বিমানবন্দর এবং ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, রেল পরিকাঠামোতেও অসাধারণ অগ্রগতি হয়েছে। একাধিক বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চালু হয়েছে, আধুনিক রেল স্টেশন, ওভারব্রিজ তৈরি হয়েছে এবং রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গত ১১ বছরে গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে যে কাজ হয়েছে, তা অতীতে হয়নি। ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান গ্যাস গ্রিড’ এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ চলছে। পূর্ব ভারতের ৬টি রাজ্যে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। আজ দুর্গাপুর জাতীয় গ্যাস গ্রিডের অংশ হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২৫-৩০ লক্ষ পরিবারে গ্যাস পরিষেবা পৌঁছবে।” প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, “সমগ্র দেশ প্রবল গতিতে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি সম্পূর্ণ বিকশিত ও আত্মনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। এই প্রকল্পগুলি সেই লক্ষ্যপূরণেরই বড় পদক্ষেপ।”
মোদীর ঘোষণা অনুযায়ী মূল প্রকল্পগুলি:
সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (সিডিজি) – ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেডের এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় প্রায় ১৯৫০ কোটি টাকার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
দুর্গাপুর-কলকাতা গ্যাস পাইপলাইন – ১৩২ কিমি দীর্ঘ এই পাইপলাইন ‘উরজা গঙ্গা’ প্রকল্পের অন্তর্গত, যা পূর্ব ভারতের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
পরিবেশবান্ধব তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প – দুর্গাপুর ইস্পাত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রঘুনাথপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বসাতে খরচ হবে প্রায় ১৪৫৭ কোটি টাকা।
রেল প্রকল্প – পুরুলিয়া থেকে কলকাতা পর্যন্ত ৩৬ কিমি রেললাইন ডাবলিং-এর জন্য ৩৯০ কোটি টাকার বাজেট।
বিহার থেকেও মোদীর টার্গেটে বাংলা
বিহারের মোতিহারির জনসভায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলার উন্নয়নের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তোলেন বীরভূম ও জলপাইগুড়ির কথা। বলেন, ‘জয়পুরের মতো পর্যটনে উন্নয়ন হবে জলপাইগুড়িতে।’ জানিয়ে দেন, বেঙ্গালুরুর মতো করে গড়ে তোলা হবে বীরভূমকে।
৭২,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধনের পর মোতিহারিতে এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেস এবং আরজেডি দরিদ্র, দলিত, পিছিয়ে পড়া শ্রেণি এবং আদিবাসীদের নামে রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তারা কখনই তাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করেননি বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। বিহারের মাটিতে দাঁড়িয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কংগ্রেস এবং আরজেডি দরিদ্র, দলিত, পিছিয়ে পড়া শ্রেণি এবং আদিবাসীদের নামে রাজনীতি করে আসছে। যাইহোক, সমান অধিকার নিশ্চিত করা তো দূরের কথা, তারা প্রায়শই তাদের পরিবারের বাইরের লোকদের প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়। এই লোকদের অহংকার আজ সমগ্র বিহার দেখছে। আমাদের অবশ্যই বিহারকে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য থেকে রক্ষা করতে হবে।”