সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘এত মানুষ মারা গেল তাদের ঠিক নেই? আর কত যাবে বাংলার সম্মান? কত আর বিশ্বকবি, বিদ্যাসাগর, গান্ধিজিকে অসম্মানিত হতে হবে? বাংলা ভাষার অস্মিতাকে অসম্মানিত হতে হবে? এর জবাব চাই, বাংলায় বিজেপিকে পা রাখতে দেওয়া যাবে না। আমি বিশ্বাস করি নেতারা পারবে না, কর্মীরা পারবে। টাকার কোনও দাম নেই, জীবন দিয়ে যেটা সঞ্চয় করবেন সেই কর্মের দাম থাকবে।’ বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার আবহে তৃনমূলের বুথ লেভেল এজেন্টদের সঙ্গে বৈঠকে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম থেকে এভাবেই হুঙ্কার দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা বলেন, ‘কী চলছে আর কী করা উচিত সেটা জানতে হবে। নির্বাচনের ২ মাস আগে ডেলিবারেট অ্যাটেম্পট। মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চায়। অটোক্রেসি চলছে। মতুয়া, তফসিলি, আদিবাসীদের ভোট থাকবে না। ৪৬ জন মারা গিয়েছেন। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি হিন্দু। বিএলও-দের দোষ নয়। কিন্তু দেখছিলাম কেন্দ্রীয় সরকারের বিএলও লাগিয়েছে। গায়ের জোরে দু’বছরের কাজ দু’মাসে করতে চাইছে। সরকার যাতে কাজ করতে না পারে। বিজেপি তাতেও আমাদের সাথে তোমরা পারবে না। সব এজেন্সিকে কাজে লাগিয়েছো। চক্রান্তকারীরা দল। দু’চোখে দুর্যোধন আর দুঃশাসন। যারা গান্ধীজির নাম কেটে দেয় তারা দেশকে কতটা ভালোবাসে জানা আছে। বাংলাকে জব্দ করতে চাইছে, ওদের স্তব্ধ করব। বিজেপি রইল পিছুর টানে, কাঁদবে তুমি কাঁদবে। আমরা যা লক্ষ্য করলাম ১.৫ কোটি নাম বাদ দিতে হবে। বিজেপি খোকাবাবুদের আবদার। হাত ঘুরিয়ে নারু পাব। বাংলাকে দখল করব। অসম্মান করব, বাংলার ইতিহাস ভুলিয়ে দেব। চালাকি! চালাকি দিয়ে মহৎ কাজ হয় না।’

নির্বাচন কমিশন যে ভোটার তালিকায় ম্যাপিংয়ের কথা বলছে সেখানে ডিলিমিটেশন বা সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি মাথায় না দেখেই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে মমতা বলেন, ‘আগে ১০০ টা ওয়ার্ড ছিল কলকাতায়। ২০০৯ এ দিলিমিটেশন হল। বিজেপির ভ্যানিশবাবুরা বিএলও-দের ট্রেনিং দিয়েছেন? বিজেপি কমিশন তৈরি করেছে। আমার কাঁচকলা করবেন। গলা কেটে দিলেও বলব মানুষের কথা। বাংলা না থাকলে দেশ থাকবে না। ২০০৪ এ লোকসভা ছিল। ডিলিমিটেশন তার পর। সেটা মনে আছে? একটা ভোটার আরেকটায় চলে গেল। আগে ছিল আলিপুর। এখন ভবানীপুর। নতুন নতুন ওয়ার্ড ঢুকল। ম্যাপিং টাই তো ভুল। এটা ডেড ব্লান্ডার। একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গায় ভোটার চলে গেছে। এগুলো মনে রাখুন। অনেকে চলে গেছেন অন্য জায়গায়। কিন্তু প্রত্যেকে জেনুইন। কেউ ‘A’ লিখতে গিয়ে ‘আ’ লিখেছে। তোমরা কলকাতায় ভোটার লিস্ট করেছ ইংরেজিতে। একটা মহল্লা, কলোনির মানুষ, হকার তোমার ইংরেজি বুঝবে কী করে? ধরুন বাংলায় একতা। কেউ ইংরেজিতে ‘এ’ লেখে, কেউ ‘আ’ লেখে। তার জন্য আত্মহত্যা করল। এর দায় তোমাদের নিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নাম মিলছে না বলছে। তখন ইনস্টিটিউশন ডেলিভারি কত ছিল? ওরে গর্ধবের দল। নিজের ইচ্ছেমতো বয়স বসিয়েছে। কতজন স্কুলে পড়ত? সার্টিফিকেট কতজনের আছে? আমার বাবা মা র জন্ম বাড়িতে। তাদের নেই। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ পারবেন? ফেক ডুপ্লিকেট বানিয়েছেন। এই বদলগুলো হয়েছে বলে বাতিল! বিএলএ আর বিএলএ ২ বড় দায়িত্ব বুঝে নিন। বাংলা আর ইংরেজিতে তফাৎ আছে। এই দুই ভাষা আলাদা হওয়ায় ম্যাপিং মিসম্যাচ করবে।’
বিজেপি ও কমিশনের মধ্যে অশুভ আঁতাঁতের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, ‘২৪ বার নির্দেশিকা বদলেছে। তোমরা কালপ্রিট, বিজেপি কালপ্রিট।পরিবারতন্ত্র করতে গিয়ে দেশ ভাসিয়ে দিচ্ছ। তোমরা কী জানো ভোট সম্পর্কে হরিদাস? ২০০২ সালের তথ্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে। নাম, ক্রমিক সংখ্যা খোঁজার জন্য উপায় নেই। ফলে বহু ভোটারকে হয়রান হতে হচ্ছে। এপিক নম্বর দিয়ে খুঁজে বের করার উপায় এতদিন ছিল না। ২০০২-এর নম্বরের সঙ্গে ২০২৫-এর নম্বরের সামঞ্জস্য নেই? এটা ক্রিমিনাল অফেন্স না? আন প্ল্যান্ড, অটোক্রেসি। খোকাবাবুরা দিল্লির লাড্ডু খেয়েও সন্তুষ্ট হয়নি। বাংলার রসগোল্লা আছে। যা বিজেপি অফিস থেকে বলা হচ্ছে তাই করছে কমিশন। একজন অফিসার আছে যে নামের তালিকা বিজেপি যা পাঠাচ্ছে সেগুলো বাদ দিচ্ছে। এরকম নির্লজ্জ কমিশন দেখিনি। বিএলও-রা এখানকার লোকাল এত ভাষা কী করে জানবে? ফলে অনেক ভোটারকে ম্যাপিং করেনি। আর ছিল সিপিএম। মার্কামারা নাম। তৃণমূল করলেই নাম বাদ। মানুষ ক্ষমা করবে না। এখন আবার বিজেপির দালালি করছে। ১৬ তারিখ থেকে হিয়ারিংয়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। ২০ তারিখ নির্দেশ এল আবার কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা হিয়ারিং করবে। এরা লোকাল ভাষা বোঝে? এরা না বোঝে বাংলা, না বোঝে মতুয়া, না বোঝে কামতাপুরী, না বোঝে নেপালি। এরা নাকি হিয়ারিং করবে! এদের ইয়ার রিং দিয়ে দিন, হিয়ারিং এড। আবার একজন করে স্পেশাল অবজারভার। বিএলও বাথরুমে গেলেও পিছন পিছন যাবে।’
বাংলায় বসবাসকারী বিহারের বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে মমতার পরামর্শ, ‘বিহারে ভোট না দিলে সম্পত্তির অধিকার দেবে না। ভুল। আপনারা যদি ওখানে ভোট না দেন, এখানে থাকেন, কাজ করেন, তাহলেও কেউ অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। বাংলায় থাকতে চাইলে ভোটার লিস্টে নাম তুলুন, বিহার থেকে নাম কাটুন।’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, ‘এইরকম অপদার্থ হোম মিনিস্টার দেখিনি। স্বৈরাচারী, দুরাচারী। বাকি শব্দ তোলা থাকল। তিনি কন্ট্রোল করছেন। তিনিই প্রধানমন্ত্রীকে কন্ট্রোল করছেন। দাঙ্গাকারীরা যদি দেশ চালায় তাহলে কী হবে বুঝুন। গান্ধীজির নাম বাদ দিয়ে রাম নাম? দেশটাকে রাম নাম সত্য হে করে দিচ্ছে। কেন অস্ট্রেলিয়া, কেন কানাডা, কেন দুবাই? এত মানুষ মারা গেল তাদের ঠিক নেই? আর কত যাবে বাংলার সম্মান? কোটি আর বিশ্বকবি, বিদ্যাসাগর, গান্ধিজিকে অসম্মানিত হতে হবে? বাংলা ভাষার অস্মিতাকে অসম্মানিত হতে হবে? এর জবাব চাই, বাংলায় বিজেপিকে পা রাখতে দেওয়া যাবে না। আমি বিশ্বাস করি নেতারা পারবে না, কর্মীরা পারবে। টাকার কোনও দাম নেই, জীবন দিয়ে যেটা সঞ্চয় করবেন সেই কর্মের দাম থাকবে। সব টাকা বন্ধ করে এখন বলছে বহুত রুপিয়া হে। তাহলে অল্প করে দেন কেন? তাও বলবেন বাইক থাকলে পাবে না, টিভি থাকলে পাবে না। কেন? আপনার বাড়িতে সব থাকবে? এদের কিছু থাকবে না? কমিশন তো লিমিটলেস দালালি করছে।’
দলের নেতা কর্মীদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এবার কোনও পিকনিক হবে না। সব হবে একেবারে ২০২৬ এ জেতার পর। কর্মীরা দেখুন, নেতারা বুঝে নিন। কাউন্সিলরদের মধ্যে কেউ কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন না। কাজ করছেন না। আরও দায়িত্ব নিতে হবে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে জানতে হবে কাদের নাম বাদ গিয়েছে। আমার জীবন আমার সংগ্রামকে সম্মান জানান তাহলে ওদের জিরো করে দিন। এই লড়াই করতে হবে। এই সাম্প্রদায়িকতা বিসর্জন দিন। ২৬ এর নির্বাচন বিজেপির বিসর্জন। বিজেপির দালালদের বিসর্জন। এসআইআর অসমে কেন হল না, মেঘালয়ে কেন হল না, মণিপুরে কেন হল না? মতুয়ারা ভয় পাবেন না আমি আছি। সব সম্প্রদায়ের মানুষ সংঘবদ্ধ হোন। নোটবন্দিতেও গেছিল, ভোটবন্দিতেও যাবে। বিজেপির টাকার কাছে আত্মসমর্পণ করব না, কমিশনের কাছে মাথানত করব না। আম্বেদকর যে অধিকার দিয়ে গেছে তার বেশি আমি কাউকে মানি না। তৃণমূল জোড়াফুল আমাদের হৃদয়। সেই হৃদয়কে আমরা বিক্রি করতে দেব না। লড়তে হবে। লড়ে ওদের ক্লান্ত করে দিতে হবে। ওরা থাকুক দেওয়ালে, তৃণমূলকে রাখুন খেয়ালে। বাংলা জিতলে দিল্লি কেড়ে নেব। বাংলাকে অসম্মান করতে গিয়ে নিজের কিছু হঠব। কেউ বিজেপিকে ভোট দেবেন না। বাংলায় কোনও সিএএ ক্যাম্প হবে না। এসআইআর আপনাদের টোটাল ব্লান্ডার। কোথাও ৭২ হাজার বাদ, আমাদের ভবানীপুরে ৪৪ হাজার বাদ! ভেবেছেন বাদ দিয়ে হারাবেন? তাতেও লড়ে নেব। হারবেন আপনারা।’