সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কয়েকদিন আগেই সংসদের বাজেট অধিবেশনে বন্দেমাতরম গানের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাঙালি লেখক তথা সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বঙ্কিমদা বলে সম্বোধন করে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবারে বাংলা তথা বাঙালির সাংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী লিখলেন স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। ঠিক যেভাবে কিছুদিন আগে বিবেকানন্দকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিনি বিবেকানন্দের নামের আগে জুড়ে ফেলেছিলেন ঠাকুর শব্দটি।
আর বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এভাবে বাংলার মনীষীদের নাম বিকৃত করার ঘটনা মোদি নিজে ঘটিয়ে ফেলায় তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি প্রতিবাদ জানিয়ে মাঠে নামতে দেরি করেননি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের ১৯১তম জন্মতিথি ঘিরেও তৃণমূল-বিজেপি রাজনৈতিক কাজিয়া চরমে উঠল। এদিন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে সোশাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী লেখেন, ‘স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংসজীকে তাঁর জন্মজয়ন্তীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য। তিনি আধ্যাত্মিকতা ও সাধনাকে যেভাবে জীবনশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা যুগে যুগে মানবতার কল্যাণ সাধন করে যাবে। তাঁর সুচিন্তিত বাণী ও বার্তা সর্বদা প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।’ নরেন্দ্র মোদির এই পোস্ট সামনে আসতেই আক্রমণ শানাতে দেরি করেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রীতিমতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বাংলার মনীষীদের বিজেপির নেতারা এইচ্ছাকৃতভাবে বারে বারে অপমান করে চলেছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে মমতা নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ‘আমি আবারও স্তম্ভিত!
বারবার একই ঘটনা ঘটে চলেছে। বাংলার মনীষীদের প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অবহেলা, অসংবেদনশীলতা, আজ তা আবার প্রকট হলো। আজ যুগাবতার শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মতিথি। এই পুণ্য লগ্নে তাঁকে প্রণাম জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর নামের আগে একটা অশ্রুতপূর্ব, অপ্রযোজ্য তকমা জুড়ে দিলেন— ‘স্বামী’!সবাই জানেন, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ আপামর মানুষের কাছে ‘ঠাকুর’ হিসেবে পূজিত। তাঁর দেহাবসানের পর তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যরা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন তৈরি করেন এবং ভারতীয় ঐতিহ্য মেনে সেই সন্ন্যাসীদের নামের আগে ‘স্বামী’ উপাধি বসে। কিন্তু স্বয়ং আচার্যদেব সব সময় ‘ঠাকুর’ নামেই পরিচিত। রামকৃষ্ণ সংঘের যে পবিত্র ত্রয়ী – ঠাকুর-মা-স্বামীজি – সেখানেও তিনি ঠাকুর; মা সারদা ‘মা’ এবং বিবেকানন্দ হলেন ‘স্বামীজি’। ঠাকুরকে ‘স্বামী’ বলার মানে বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা ও অবহেলা ছাড়া আর কিছুই না। আমি প্রধানমন্ত্রীকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি, আধুনিক ভারতের রূপকার বাংলার এই নবজাগরণের মহাপুরুষদের অপমান করা দয়া করে বন্ধ করুন। তাঁদের জন্য রোজ নতুন নতুন বিশেষণ আবিষ্কার করার কোনো প্রয়োজন নেই। দয়া করে, বাংলার আবেগকে এভাবে বারবার আঘাত করা বন্ধ করুন।’
তৃণমূলের অন্যতম রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী পোস্টে লিখেছেন স্বামী রামকৃষ্ণ পরমহংস। স্বামী শব্দটি এখানে ব্যবহারের নয়, বিজেপি জানে না। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্য ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। প্রধানমন্ত্রী আর বিজেপি বাংলা এবং বাংলার প্রণম্যদের সম্পর্কে জানে না। ধারাবাহিক ভুল চলছে, অবিলম্বে পোস্ট সংশোধন করুন প্রধানমন্ত্রী।’