ভূমিকা: পারস্যের অবিস্মরণীয় যুদ্ধবাহিনী
আকেমেনিড সাম্রাজ্যের এক বিখ্যাত বিশেষ বাহিনী ছিলো ‘ইমমোর্টালস’—দশ হাজার সদস্যের একটা অভিজাত পদাতিক ইউনিট, যার সংখ্যা সব সময় অপরিবর্তনীয়। গ্রীক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস এই বাহিনীর নাম দেন ‘অথানাটোই’, যার মানে ‘অমররা’, কারণ যাঁদের কোনো একজনও আহত হলে বা নিহত হলে সঙ্গে সঙ্গে পৃথক একজন তাকে বদলি করত। ফলে বাহিনীর সংখ্যা দেহে অক্ষুণ্ণ থেকে যেতো ।
১. গঠন ও মূল ভুল ধারণা
গ্রীক ভাষায় যাকে তথ্য মিনি شدند ‘ইমমোর্টালস’, আসল পার্সিয়ান ভাষায় সম্ভবত ছেলের অনুসরণকারী (anusiya) এক বিশেষ শ্রেনি ছিল—অমরের ধারণা সম্ভবত ভাষাগত বিভ্রাটে এসেছে ।
গ্রীক এথেনিয়াস, জেনোফোনসহ অনেক লেখক হেরোডোটাসের তথ্য অনুসরণ করে এদের উল্লেখ করেন কিন্তু কোনো পার্সীয় উৎসে ‘ইমমোর্টাল’ শব্দটি পাওয়া যায় না ।
২. প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস
এই ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন সাইরাস দ্য গ্রেট (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ ই–৫৩০ ই) রাজ্যশাসন শুরুতে, যারা তাকে তৈরি করেছিলেন তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো সাম্রাজ্যবিস্তারে দ্রুত প্রাধান্য নিশ্চিত করা ।
তারা মিশরে, মেসোপটামিয়ায়, সিন্ধু ও পাঞ্জাবে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন; এবং থার্মোপাইলি ও গগোমেলা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল ।
৩. ইমমোর্টালদের সামরিক গঠন ও প্রশিক্ষণ
সদস্য সংখ্যা ঠিক দশ হাজার। কেউ আহত বা নিহত হলে তার স্থান দেরি না করে পূর্ণ করা হতো ।
বাছাই হত পার্স, মিড ও এলাম অঞ্চলের অভিজাতদের মধ্য থেকে। প্রশিক্ষণের শুরু শিশুকাল থেকেই, বয়সে প্রায় ২০ হলে পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত হতো ।
শারীরিক কন্টাক্ট, ধৈর্য, অস্ত্র দক্ষতা—সবই কঠোরভাবে প্রশিক্ষিত হত।
৪. সাজসজ্জা ও অস্ত্র
তাঁরা পরতেন স্কেল আর্মার (মাছের আঁশসদৃশ), রঙিন টিউনিক, প্রাতিষ্ঠানিক হেডড্রেস (Tiara বা Phrygian cap) ।
অলঙ্কৃত পোশাক ও সোনার গহনা যুদ্ধক্ষেত্রে মানসিক প্রভাব ফেলত ।
অস্ত্র: ছোট বর্শা (short spear) যার নিচের অংশে আপেলের মতো ওজন (সামান্য ৯,০০০ জন সুস্পর্শ হয় রূপা, ১,০০০ জন অফিসারদের জন্য সোনা) ।
ঢাল তৈরি হত বাঁশ ও চামড়া দিয়ে (wicker shield), পাশাপাশি ছোট তলোয়ার বা ছুরি, বেতি, তীর-ধনুকও থাকত ।
৫. মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত প্রভাব
বাহিনীর দৃঢ় উপস্থিতি শত্রুকে মানসিকভাবে বিপাক সৃষ্টি করত। ব্রোঞ্জ বা লোহার বর্ম সূর্যের আলোতে ঝলমল করে যুদ্ধক্ষেত্রে ভয় ছড়িয়ে দিত ।
থার্মোপাইলির যুদ্ধে গ্রীকদের অবস্থান ঘিরে, ইমমোর্টালরা অন্য পথে ঘুরে গিয়ে পেছনদিক থেকে আক্রমণ চালায়—কৌশল ও নমনীয়তার প্রমাণ ।
৬. উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও অভিযান
Opis (539 ই): ব্যাবিলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জয়ের সময় একদম সামনের সারিতে মাঠে ছিল ইমমোর্টালরা ।
মিশর বিজয় (525 ই): ক্যাম্বাইস II-এর নেতৃত্বে, ফ্যান্টাসি–যুদ্ধ কৌশল (cats on shields) সফলভাবে পরিণতি বয়ে আনে ।
Thermopylae (480 ই): গ্রীককে চাপিয়ে দেওয়া তেও ব্যর্থ; তবুও মানসিক প্রভাব মারাত্মক ছিল ।
Gaugamela (331 ই): আলেকজান্ডার বিরুদ্ধে রণক্ষেত্রে শেষতম পরীক্ষা তাদের—যেখানে পারস্য পরাজিত হলেও ইমমোর্টালদের সাফল্য স্মরণীয় ।
৭. সামাজিক অবস্থা ও পরবর্তী জীবন
৫০ বছর বয়সে অবসর; ‘পেনশন’ ও জমি দিয়ে সম্মানজনক অবসর জীবন দেয়া হত ।
তারা ছিল রাজা ও সাম্রাজ্যের সরাসরি রক্ষাকবচ; অনেককে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হত।
৮. উত্তরসূরি বাহিনী ও উত্তরাধিকি
আলেকজান্ডার পারস্য জয় করার পর ‘Immortals’-এর অনুকরণে নিজের অভিজাত গার্ড তৈরি করেছিলেন, যারা তাঁর দরবারেই দায়িত্ব পালন করত—দীর্ঘ, চৌকস, সজ্জিত বীর যাঁরা রক্ষা করতেন নতুন সম্রাটকে ।
সাসানীয় সাম্রাজ্যে ‘জাভিদান (Immortals)’ নামে ১০,০০০ সদস্যের অভিজাত বাহিনী পুনরায় গঠিত হয়, কিন্তু এদের জনপ্রিয়তা ও সংখ্যা পৌরাণিকভাবে ঐতিহ্যহীন ।
৯. সমালোচনা ও আধুনিক গবেষণা
অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদ দাবি করেন, ‘ইমমোর্টাল’ নামটি সম্ভবত ভাষাগত ভুল; আসল ‘companions’ হওয়া উচিত ছিলো ।
তবে বাহিনীর দিক থেকে তারা ছিল ‘shock troops’, আত্মীয়ভাবে প্রশিক্ষিত এবং মানসিক কৌশল প্রয়োগে সক্ষম ।
Persian Immortals শুধু একটি সেনাবাহিনী ছিল না; এটা ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের শক্তি, ঐশ্বর্য ও সুশাসন প্রতীক।
দশ হাজারে ধ্রুব থাকা সংখ্যা,
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে প্রভাবশালী উপস্থিতি,
সম্মান ও স্বীকৃতিতে অগ্রস্থান,
সেই কারণে তারা প্রাচীন ইতিহাসের এক কিংবদন্তি।
আজও ‘Immortals’ ধারণা আধুনিক সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সাহিত্যে প্রসিদ্ধ—সিনেমা, উপন্যাস, গেমস বা কমিক বইতে। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এটি ইতিহাস, সাহসিকতা ও কৌশলপূর্ণ এক অধ্যায়।