সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘উনি দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না! আমার দলের নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করাচ্ছেন! আমি প্রতীককে ফোন করেছিলাম। ও আমার দলের ইনচার্জ। ওরা হার্ড ডিস্ক, ফোন সব নিয়ে নিচ্ছিল।’ তৃণমূলের রাজনৈতিক উপদেষ্টা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ও অফিসে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তল্লাশি অভিযান নিয়ে এভাবেই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আজ সকাল ছয়টা থেকেই কলকাতায় প্রতীকের বাড়ি এবং সল্টলেকে আইপ্যাক এর অফিসে তল্লাশির অভিযান শুরু করে ইডি। তাই খবর পাওয়ার পরেই কলকাতা পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা এবং ডিসি সাউথ কে সঙ্গে নিয়ে সোজা প্রতীকের বাসভবনে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। সুদূর অতীতে এমন ছবি কখন দেখা গিয়েছে তা মনে পড়ে না। এর আগে রাজীব কুমারের সময় মুখ্যমন্ত্রী ধরনায় বসতে দেখা গিয়েছিল। তবে এবার ভোট কুশলী আইপ্যাকের অন্যতম কর্নধার প্রতীকের বাড়িতে তল্লাশি চালাতেই পৌঁছলেন মমতা। আজ সকালে প্রথমে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের আইপ্যাকে তল্লাশি চালাচ্ছিল। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় সংস্থার আরও একটি দল পৌঁছে যায় বেসরকারি ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্য়াকের কর্নধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে। প্রতীক থাকেন ৭ লাউডন স্ট্রিটের আবাসনে। সূত্রের খবর, দিল্লিতে আর্থিক প্রতারণা মামলায় আই-প্যাকের যোগসূত্র আছে কি না তা খতিয়ে দেখতেই তল্লাশি অভিযানে নামে ইডি। ৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রতীক জৈনের বাড়িতে যখন তল্লাশি চালায়, তখন শেক্সপিয়ার থানার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে আবাসনের নীচে কথা কাটাকাটি হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর। পুলিশকে আবাসনের প্রধান গেটের বাইরে যেতে অনুরোধ করে কেন্দ্রীয় বাহিনী। ইডি আধিকারিকদের সামনেই প্রতীকের বাসভবন থেকে বেশ কিছু ফাইল এবং হার্ডডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে আসেন মমতা। আইপ্যাক কর্ণধারের বাড়ি থেকে বেরোনোর পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওরা আমার দলের সমস্ত নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করছিল! আমি সেগুলো নিয়ে এসেছি। দলের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতীককে মাঝেমধ্যে ফোন করি। বিষয়টি জানতাম না প্রথমে। যখন ওকে ফোন করি, ও ধরেনি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ওর কাছে ওর ফোন নেই। ইডি ওর ফোন নিয়ে নিয়েছে। তখন মনে হয়, ওরা আমাদের কৌশল নিয়ে নিয়েছে। তার পরেই সেখানে চলে যাই। যখন আমার কেউ বিপদে পড়েন, আমার দায়িত্ব তাঁর পাশে দাঁড়ানো। এজেন্সি লাগিয়ে আমাদের কাগজ লুট করছে। কৌশল লুট করছে। ডেটা, ভোটার, বাংলা লুট করছে। ভাষা লুট করে। শূন্যতে আসবে (বিজেপি)। প্রধানমন্ত্রী, আপনার উচিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করা। ওরা আমাদের অর্থনৈতিক কাগজ, হার্ডডিস্ক, কৌশল চুরি করেছে।’
এরপরে তিনি পৌঁছে যান সল্টলেকে আই প্যাক এর দপ্তরে যেখানে তল্লাশি অভিযান চলছিল সকাল থেকেই। সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতর যে ভবনে রয়েছে, তার বেসমেন্টে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বলেন, ‘ভোটের স্ট্র্যাটেজি ছিনতাই করেছে। এসআইআরের কাজ চলছে। আমার দল মানুষকে সাহায্য করছে। ফরেন্সিক দলের মাধ্যমে আমাদের কাগজ, তথ্য সব ট্রান্সফার করেছে। ভোটের কাজ চলছে। ওরা সব তথ্য ট্রান্সফার করেছে। আমি মনে করি এটা অপরাধ।’ তিনি জানান, আইপ্যাক শুধু বেসরকারি সংস্থা নয়, সর্বভারতীয় তৃণমূলের ‘অথরাইজ়ড টিম’। তাঁর কথায়, ‘দফতর থেকে সব কাগজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সব টেবিল ফাঁকা। সেই নথি আবার তৈরি করার প্রয়োজন পড়লে অনেক সময় লাগত। তত দিনে ভোট পেরিয়ে যেত। এই কাজ কি ঠিক হল?’ এর পরেই তিনি আঙুল তোলেন বিজেপির দিকে। তাঁর কথায়, ‘বিজেপির মতো এত বড় ডাকাত দেখিনি।’ আঙুল তুলেছেন ইডির দিকেও। তিনি বলেন, ‘আমরা নথিভুক্ত রাজনৈতিক দল। আমরা কর দিই। অডিট হয়। প্রয়োজন থাকলে ইডি আয়কর দফতর থেকে কাগজ নিতে পারত। বিজেপি সবচেয়ে বড় অপরাধী। চোরেদের দল। ওরা বিজেপি-কে নোটিস পাঠায় না। ভোট এলে আয়কর দফতর আমাদের নোটিস পাঠায়।’

এখানেই থামেননি মমতা। তিনি বলেন, ‘ভোর থেকে অপারেশন চালু করেছে। সকাল ৬টার সময়ে এখানে (আইপ্যাকের দফতর) শুরু হয়েছে, যখন অফিসে প্রায় কেউ ছিলেন না। আমাদের সঙ্গে চিটিং করলে, জুয়া খেললে মেনে নেব না।’ তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে এর পরে বলেন, ‘আমি যদি বিজেপির পার্টি অফিসে হানা দেওয়াই? সেটা ঠিক হবে?’ তিনি বিজেপি-কে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘একতরফা কিছু হয় না। এখনও চুপ রয়েছি। এত জ্বলার পরেও সহ্য করছি। এত প্রাণ যাওয়ার পরেও বিচারের অপেক্ষায় রয়েছি। সীমা লঙ্ঘন করেই চলেছে। তোমরা আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি দফতরে ঢুকে তথ্য চুরি করেছ। আইপ্যাক আমাদের অথরাইজ করা। আমরা বিজেপির মতো বেআইনি কিছু করি না।’ তিনি জানান, এটা আসলে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রকে অপমান। তাঁর প্রশ্ন, ‘এটা কি স্বাধীনতার খুন নয়?’
মুখ্যমন্ত্রী এর পরেই আঙুল তোলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দিকে। তিনি বলেন, ‘এজেন্সি লাগিয়ে আমাদের কাগজ লুট করছে। কৌশল লুট করছে। ডেটা, ভোটার, বাংলা লুট করছে। ভাষা লুট করে। শূন্যতে আসবে (বিজেপি)। প্রধানমন্ত্রী, আপনার উচিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করা। ওরা আমাদের অর্থনৈতিক কাগজ, হার্ডডিস্ক, কৌশল চুরি করেছে।’

এর পরে পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘আমি সৌজন্য দেখাই। সহ্য করি। এটা দুর্বলতা নয়। সব লুট করলে, ছিনতাই করলে হজম করব না। আগে সব ডিটেল পাই। তার পর কী পদক্ষেপ করব, জানাব।’ আই প্যাকের দফতর থেকে ফাইল নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ফাইলগুলি আমাদের। আমরা রেখেছি। আমাদের কাগজ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। আমার দলের কাগজ। ফরেন্সিক দল এনে অনেক ট্রান্সফার করেছে। এফআইআর হবে। বহু পরামর্শ আসে আমাদের। সেগুলো জমিয়ে রাখি। ভোটের আগে কাজে লাগাই। অপরাধ করে ওরা নিয়ে নিয়েছে। ওরা ভোটের আগে আমাদের বিপাকে ফেলতে চাইছে, কিন্তু নিশ্চিত করছি, ওরাই বিপদে পড়বে।’